সিরাজ সিকদার রচনাঃ ১-ক উপব্যুরোর আওতাধীন অঞ্চলসমূহের আঞ্চলিক পরিচালকদের বৈঠকে ১নং ব্যুরো পরিচালক কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাবসমূহ (দ্বিতীয় সপ্তাহ, জুন ১৯৭৩)

সিরাজ সিকদার রচনা

১-ক উপব্যুরোর আওতাধীন অঞ্চলসমূহের আঞ্চলিক পরিচালকদের বৈঠকে ১নং ব্যুরো পরিচালক কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাবসমূহ

(দ্বিতীয় সপ্তাহ, জুন ১৯৭৩)

sikder

সাংগঠনিক

১। ১-ক উপব্যুরোর আওতাধীন অঞ্চলসমূহকে বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের পশ্চাদভাগ হিসেবে ব্যবহার করা হবে।
২। পশ্চাদভাগ হিসেবে যথাযথভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যেঃ
– কাজকে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করতে হবে;
– কর্মীদের মানোন্নয়ন করে কিছুসংখ্যক দক্ষ কর্মী তৈরী করতে হবে;
– ব্যাপক ও বিস্তৃত এলাকায় শেল্টার তৈরী করতে হবে;
– জিনিসপত্র ও অস্ত্রশস্ত্র রাখার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা তৈরী করতে হবে;
– এমন কোন হামলা করা চলবে না যাতে অঞ্চলে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয় এবং আমাদের কাজ ব্যাহত হয়।
৩। ১-ক উপব্যুরোর আওতাধীন অঞ্চলসমূহে কাজ বিকাশের উদ্দেশ্যে নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করতে হবেঃ
– যে সকল এলাকায় কাজ হয়েছে তার মধ্যে কতকগুলোকে আঁকড়ে ধরে উপ অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্য এলাকা সমূহেও যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে;
– সমগ্র অঞ্চলকে উন্নত করার জন্য তাড়াহুড়া না করে সমগ্র অঞ্চল এক সংগে না ধরে ১টা বা ২টা উপঞ্চলকে আঁকড়ে ধরে গড়ে তুলতে হবে, এভাবে ধাপে ধাপে সমগ্র অঞ্চলকে সুপরিকল্পিতভাবে উন্নত করতে হবে।
৪। কর্মীদের মানোন্নয়নের উদ্দেশ্যেঃ
– সক্রিয়, অগ্রসর কর্মীদের মধ্যে কয়েকজনকে আঁকড়ে ধরতে হবে। ব্যক্তিগত গাইডেন্সে রেখে উন্নত করতে হবে।
– স্থানীয়ভাবে শিক্ষা সম্মেলন করতে হবে এবং বিশেষ ট্রেনিং-এর জন্য অন্য অঞ্চলে নেওয়া যাবে;
– সুনির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম অনুসারে কর্মীদের মানোন্নয়ন করতে হবে;
– কয়েকটি কেডার স্কুল তৈরী করতে হবে।
৫। ১-ক উপব্যুরোর আওতাধীন অঞ্চলসমূহে উন্নতমানের গাইড ও কুরিয়ার তৈরী করতে হবে।
৬। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে।
৭। আগামী ৫/৬ মাস পর্যন্তঃ
১-ক উপব্যুরোর কাজের প্রধান দিক হচ্ছে ব্যাপক বিস্তৃতি ও সুসংবদ্ধকরণ—সশস্ত্র সংগ্রাম নয়।
পরবর্তী শুকনো ঋতুতে এসব অঞ্চলে সশস্ত্র সংগ্রাম চলবে।
৮। বিশেষ সামরিক সার্কুলার উচ্চস্তরেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে।
৯। ভবিষ্যতে আমাদের পরিবারসহ বেশ কিছু বাসস্থানের প্রয়োজন হবে। এ উদ্দেশ্যে এখন থেকেই কিছু পরিবারকে ট্রেইন করতে হবে।
১০। বিভিন্ন অঞ্চলের মুক্তি বাহিনী সংসদে ঢুকে পড়তে হবে, নেতৃত্ব দখল করতে হবে।

রাজনৈতিক

১১। রাজনীতি হচ্ছে সকল কাজের প্রাণসূত্র।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন থেকে আসে সঠিক সাংগঠনিক পদক্ষেপ। আমাদের সব সময়ই রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
তা না হলে আমাদের সাং গঠনিক পদক্ষেপসমূহ হবে অন্ধ ও অদূরদর্শী এবং অনিবার্যভাবেই আমরা প্রতিক্রিয়াশীলদের ফাঁদে আটকা পড়ব।
১২। পূর্ববাংলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দল ও তাদের তাবেদারদের পরে ‘জাসদ’ই হছে আমাদের একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী।
পূর্ববাংলার জনগণের প্রচণ্ড ভারত বিদ্বেষকে কাজে লাগিয়ে ‘জাসদ’ ক্ষমতাকে দখল করতে চায় এবং মার্কিনের উপনিবেশ কায়েম করতে চায়।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ পুতুল সরকারের উপর মার্কিন প্রভাব ও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ এবং বিপ্লবী যুদ্ধের অনুপস্থিতি প্রভৃতির ফলেই জাসদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এবং বিকাশ লাভ করা সম্ভব হয়েছে।
‘জাসদ’ সম্পর্কে আমাদের খুবই সতর্ক থাকতে হবে এবং কেডার ও জনগণের কাছে জাসদের মুখোশ ভালভাবে উন্মোচিত করতে হবে।
১৩। ১৯৭১-এর সংগ্রামের সময় আওয়ামী লীগ যে ভূমিকা নিয়েছিল ভবিষ্যতে ‘জাসদ’ও একই ভূমিকা নিতে পারে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীন ও আমেরিকার স্বাভাবিক সম্পর্কের ফলে ‘জাসদ’ হয়তো এখন আমাদের বিরুদ্ধে কিছু বলছে না বা করছে না, কিন্তু ‘জাসদ’ এর শ্রেণী চরিত্র ও বর্তমান অবস্থা বিশ্লেষণ করলে ৩টি সম্ভাবনা বেরিয়ে আসেঃ
ক) ‘জাসদ’ খুব শক্তিশালী হয়ে আওয়ামী লীগকে উৎখাতের চেষ্টা করবে এবং একই সঙ্গে আমাদের বিরুদ্ধে খতম অভিযান চালাবে।
খ) ‘জাসদ’ দুর্বল, আওয়ামী লীগের পিটুনী খেয়ে আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।
গ) ‘জাসদ’ দুর্বল, কিন্তু আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে একযোগে আমাদেরকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টা চালাবে।
১৪। ‘জাসদ’ সম্পর্কে উপরোক্ত রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নলিখিত সাংগঠনিক পদক্ষেপসমূহ নিতে হবে—
ক) কেডার ও জনগণের কাছে জাসদের মুখোশ ভালভাবে উন্মোচিত করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে বিশেষ রাজনৈতিক পাঠ্যসূচী হিসেবে নিম্ন দলিলাদি পড়তে হবে—
– পূর্ববাংলার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে কয়েকটি কথা;
– ছাত্রলীগের রব গ্রুপের নিকট কয়েকটি প্রশ্ন;
– সমাজতন্ত্র, শ্রেণীসংগ্রাম ও সামাজিক বিপ্লব প্রসঙ্গে।
খ) ‘জাসদ’ থেকে যে সব লোক রিক্রুট হবে তাদের সম্পর্কেঃ
– তাদেরকে জাসদের চরিত্র সম্পর্কে ভালভাবে বুঝাতে হবে;
– ভালভাবে রাজনৈতিক মান উন্নত করতে হবে;
– তাদের গতিবিধির উপর সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে;
– নেতৃস্থানীয়দের শেল্টার চেনানো চলবে না;
– গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগসমূহ চেনানো চলবে না;
– গুরুত্বপূর্ণ শেল্টার ও অস্ত্রের শেল্টার চেনানো চলবে না;
– নিম্নস্তরে দীর্ঘদিন রেখে যাচাই করতে হবে।
১৫। তোয়াহারা বর্তমানে আমাদের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা করছে।
এটা প্রমাণ করে যে, তারা রাজনৈতিকভাবে সুর্বল ও দেউলিয়া হয়ে পড়েছে এবং রাজনৈতিক সমালোচনা করতে না পেরে ব্যক্তিগত কুৎসা ও ছিদ্রানুসন্ধানকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ইহা তাদের দুর্বলতা ও দেউলিয়াত্ব প্রমান করছে। অচিরেই তাদের কর্মীরাও এ সত্য উপলব্ধি করবেন।
১৬। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন আলোড়নমূলক, উত্থান-পতনমূলক পরিবেশ (Turmoil)।
আলোড়নমূলক পরিবেশে বিপ্লবী শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।
উত্থান-পতনমূলক বা আলোড়নমূলক পরিবেশের সুযোগ গ্রহণ করার জন্য যে সংগঠন সর্বাপেক্ষা ভাল প্রস্তুতি নিতে পারে তার পক্ষেই ক্ষমতা দখল করা সম্ভব।
আমাদের দেশে বর্তমানে উত্থান-পতনমূলক বা আলোড়নমূলক পরিবেশ বিরাজ করছে। এ পরিবেশের পরিপূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করার জন্য আমাদের অবশ্যই ভালভাবে প্রস্ততি নিতে হবে।

মতাদর্শগত ও চিন্তাধারাগত

১৭। মতাদর্শগত পুনর্গঠনের মৌলিক সমস্যা হচ্ছে সর্বহারা বিশ্ব দৃষ্টিকোণ অর্জন করার সমস্যা।
সর্বহারা বিশ্ব দৃষ্টিকোণ অর্জন করতে হলে—
– প্রতিটি সমস্যা সর্বহারা বিশ্বদৃষ্টিকোণ দ্বারা বিচার করা।
– প্রতিটি কাজ সর্বহারা বিশ্বদৃষ্টিকোণ দ্বারা কার্যকরী করার অভ্যাস করতে হবে।
১৮। পরিবর্তন, প্রতিযোগিতা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাই হচ্ছে বিকাশ।
এগুলো কার্যকরী না হলে আসবে স্থবিরতা ও আমলাতন্ত্র।
এ কারণে কেডারদের মধ্যে, এলাকাসমূহের মধ্যে, অঞ্চলসমূহের মধ্যে প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করতে হবে।
বাসীদের পরিবর্তন করতে হবে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা ব্যতীত কাজকে উন্নততর করা এবং উন্নততর ধারণা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এ কারণে কাজকে উন্নত করার জন্য আমাদের অবশই সাহসিকতার সাথে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে।
১৯। প্রত্যেক কাজের জন্য প্রয়োজন—
– সর্বপ্রথম মৌলিক নীতি (রণনীতি) ও পরিকল্পনা ঠিক করা।
রণনীতিগত ধারণা ব্যতীত বর্তমান যুগে বিপ্লবী কাজ করা অসম্ভব।
কাজেই আমাদের অবশ্যই রণনীতিগত ধারণা অর্জন করতে হবে, প্রতিটি কাজ করার পুর্বে পরিকল্পনা করতে হবে।