সিরাজ সিকদার রচনাঃ পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচী (জুন ১৯৭৩)

সিরাজ সিকদার রচনা

পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের
ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচী

(জুন ১৯৭৩)

sikder

পূর্ববাংলার বিভিন্ন দেশপ্রেমিক শ্রেণী, স্তর, গোষ্ঠী, ব্যক্তি, দল, জাতিগত, ধর্মীয় এবং ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণ অর্থাৎ পূর্ববাংলার সমগ্র জনগণ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের উৎখাত করে পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচণ্ড সংগ্রাম শুরু করেছেন। জনগণ চান এমন একটি নেতৃত্ব যা তাদের সংগ্রামকে সঠিক পথে পরিচালনা করে বিজয় আনয়ন করতে সক্ষম।
তারা আরো আশা করেন, এ নেতৃত্ব হবে এমন একটি সংগঠন যা পূর্ববাংলার সকল দেশপ্রেমিক শ্রেণী, স্তর, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল, জাতিগত, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণের প্রতিনিধি সম্বলিত।
জনগনের এ আশা-আকাঙ্খা বিবেচনা করে নিম্নলিখিত দেশপ্রেমিক সংগঠনসমূহ ঐক্যবদ্ধ হয়ে এরূপ একটি সংগঠন গড়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়।
এ সংগঠনের নাম ‘পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট’ রাখা হয়। পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানকারী সংগঠনসমূহঃ
১। পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি
২। পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী
৩। পূর্ববাংলার শ্রমিক ও কর্মচারী মুক্তি সমিতি।
৪। পূর্ববাংলার কৃষক মুক্তি সমিতি
৫। পূর্ববাংলার ছাত্র-যুব মুক্তি পরিষদ
৬। পূর্ববাংলার নারী, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, সংবাদপত্র ও সাহিত্য মুক্তি সমিতি
৭। পূর্ববাংলার জাতিগত সংখ্যালঘু মুক্তি পরিষদ
৮। পূর্ববাংলার ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুক্তি পরিষদ
৯। পূর্ববাংলার দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি সমিতি
১০। পূর্ববাংলার দেশপ্রেমিক ওলেমা সমিতি
১১। পূর্ববাংলার বিভিন্ন দেশপ্রেমিক গ্রুপ ও বামপন্থীদের প্রতিনিধি পরিষদ
এ সকল দেশপ্রেমিক সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিরা মিলিত হয়ে ২০শে এপ্রিল, ১৯৭৩ সালে “পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট” গঠন করে।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টকে সমগ্র পূর্ববাংলা ব্যাপী সংগঠিত করা এবং অস্থায়ীভাবে এর কার্য পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির প্রতিনিধি জনাব সিরাজ সিকদারকে সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়।

পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের ঘোষণাপত্র

পূর্ববাংলার জনগণ সর্বদাই সকল প্রকার বৈদেশিক হামলা ও শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং প্রতিরোধ চালিয়েছেন।
পূর্ববাংলার জনগণের ইতিহাস হচ্ছে বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের ইতিহাস।
পূর্ববাংলার জনগণ বৃটিশ উপনিবেশবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র এবং ধর্মীয় অধিকার অর্জনের জন্য সংগ্রাম করেন এবং পাকিস্তানে যোগদান করেন।
পাকিস্তানের ফ্যাসিস্ট শাসক গোষ্ঠী পূর্ববাংলার জনগণকে জাতীয় অধিকার ও গণতন্ত্র প্রদানের পরিবর্তে জাতীয় নিপীড়ণ এবং শোষণ-লুন্ঠন পরিচালনা করে।
পূর্ববাংলার জনগণ প্রথম থেকেই পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী বিরোধী সংগ্রাম পরিচালনা করেন।
১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ববাংলার জনগণ বাংলা ভাষাকে বিলুপ্ত করার চক্রান্তকে নস্যাৎ করেন।
১৯৫৪ সালের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সামরিক শাসন বিরোধী সংগ্রাম, ষাটের দশকের বিভিন্ন আন্দোলন করেন।
শেষ পর্যন্ত পূর্ববাংলার জনগণ জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের জন্য ১৯৭১ সালে বিদ্রোহ করেন।
পূর্ববাংলার জনগণ পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন, লক্ষ লক্ষ জনগণ প্রাণ হারান, তাদের ধন-সম্পত্তি বিনষ্ট হয়।
আওয়ামী লীগ ও তার তাবেদাররা পূর্ববাংলার জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে। তারা মীরজাফরের মত গদীর লোভে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের নিকট পূর্ববাংলাকে বিকিয়ে দেয়।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা পূর্ববাংলা দখল এবং এখানে তার উপনিবেশ স্থাপনের জন্য সর্বদাই প্রচেষ্টা চালিয়েছে। তারা আওয়ামী লীগ ও তার তাবেদারদের প্রদত্ত সুযোগ গ্রহণ করে। তারা সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সহায়তা ও সমর্থনে পূর্ববাংলা দখল করে নেয়। এভাবে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা পূর্ববাংলায় তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে।
পূর্ববাংলায় ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের উপনিবেশ স্থাপনের একটি উদ্দেশ্য হলো—পূর্ববাংলার পাট, চা, চামড়া ও অন্যান্য কাঁচামাল, মাছ, মাংস, তরিতরকারী, চাল ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্য লুন্ঠন করা, সাড়ে সাত কোটি জনগণের বাজার দখল করা, পূর্ববাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প প্রভৃতি নিয়ন্ত্রণ করা, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন করা, শিক্ষা-সংস্কৃতি বিনষ্ট করা, প্রশাসন ব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের পূর্ববাংলায় উপনিবেশ স্থাপনের অপর এক উদ্দেশ্য হলো পূর্ববাংলার জনগণ, ভারতীয় জনগণ এবং নাগা-মিজো-কাশ্মীরীদের মুক্তি সংগ্রাম দাবিয়ে রাখা, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভুত্ব করা।
সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদীরা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদকে সহায়তা ও সমর্থন করছে ভারতের উপর তার আধিপত্য জোরদার করা, পূর্ববাংলা লুন্ঠনের বখরা নেওয়া, পূর্ববাংলায় সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং এশিয়ায় কর্তৃত্ব স্থাপন করার জন্য।
মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীরা সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে পূর্ববাংলা ও ভারতে তাদের কর্তৃত্ব স্থাপনের জন্য।

আওয়ামী লীগ এবং অন্যান্য বিশ্বাসঘাতকরা প্রকাশ্য ও গোপন চুক্তির মাধ্যমে পূর্ববাংলাকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের হাতে তুলে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টরা জনগণকে ধোকা দেওয়া এবং নিজেদের চরিত্র গোপন করার বহু প্রচেষ্টা চালিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তারা তথাকথিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেছে, জাতীয় পরিষদ গঠন করেছে এবং জনগণের স্বার্থবিরোধী আইন প্রণয়ন করেছে।
কিন্তু জনগণ তাদের প্রতারণায় বিভ্রান্ত হননি। তারা বুঝতে পেরেছেন, ‘বাংলাদেশ’ সরকার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের পুতুল সরকার ব্যতীত কিছুই নয়।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের শোষণ ও লুন্ঠন, তার তাবেদারদের শোষণ ও লুন্ঠন, অরাজকতা, মুদ্রামান হ্রাস, কালোবাজারী, পাচার, রাহাজানি, হাইজ্যাক, স্বজনপ্রীতি প্রভৃতির ফলে পূর্ববাংলার অর্থনীতি, প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের চক্রান্তের ফলে পূর্ববাংলার সামরিক বাহিনীর বিকাশ বন্ধ হয়েছে।
এভাবে পূর্ববাংলাকে পরিপূর্ণরূপে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের উপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের নির্মম শোষণ ও লুন্ঠনের ফলে পূর্ববাংলার জনগন অর্ধাহারে, অনাহারে, কাপড়ের অভাবে দিন যাপন করছেন।
নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যের ক্রমবর্ধমান উচ্চমূল্য, বেকারত্ব, যানবাহনের অভাব, জনগণের জীবনযাত্রার মান দ্রুত নামিয়ে দিয়েছে।
পূর্ববাংলার জনগণ কখনো এত কষ্টকর জীবন যাপন করেননি। পক্ষান্তরে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাবেদার বিশ্বাসঘাতক দেশ বিক্রেতারা রাতারাতি অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত রয়েছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদাররা পূর্ববাংলার জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণের জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম ধ্বংস করার জন্য নির্মম নির্যাতন চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ পুতুল সরকার ও তার প্রভু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা জনগণকে দাবিয়ে রাখা ও তাদের উপর ফ্যাসিস্ট একনায়কত্ব চালাবার জন্য বিভিন্ন সশস্ত্র ভাড়াটে বাহিনী গঠন করেছে এবং জনগণের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা যৌথ কার্যক্রমের মাধ্যমে পূর্ববাংলার বিভিন্ন বাহিনীকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে রক্ষী বাহিনী গঠন করেছে।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের শোষণ ও লুন্ঠন বিরোধী জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামকে ধ্বংস করার জন্য বাংলাদেশ পুতুল সরকার হত্যা, গ্রেফতার, জেল-জুলুম ও অন্যান্য ফ্যাসিস্ট তৎপরতা চালাচ্ছে।
তারা মিটিং, মিছিল, ধর্মঘট বানচাল করছে, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করছে, সরকার বিরোধী তৎপরতাকে নির্মূল করার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
এভাবে তারা জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হরণ করছে।
পূর্ববাংলার জনগণ আজ উপলব্ধি করেছেন আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টরা যে গণতন্ত্র কায়েম করেছে তা হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের ফ্যাসিস্ট একনায়কতন্ত্র, তারা যে সমাজতন্ত্র কায়েম করেছে তা হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার এবং সোভিয়েট ও মার্কিন শোষকদের শোষণ ও লুন্ঠন। তারা যে জাতীয়তাবাদের কথা বলে তা হচ্ছে জাতীয় পরাধীনতা, পূর্ববাংলার জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণ এবং ঊর্দু ভাষাভাষীদের নির্মূল করা। তারা যে ধর্মনিরপেক্ষতা চায় তা হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের শোষণ ও লুন্ঠনের পথে মুসলিম ধর্মের যে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দাবিয়ে রাখা এবং দেশপ্রেমিক হিন্দু ও মুসলিম জনগণের ঐক্যকে বিনষ্ট করা।
মুজিববাদ হচ্ছে জাতীয় বিশ্বাসঘাতকতা ও ফ্যাসিবাদ।

সমগ্র পূর্ববাংলায় একটি বিস্ফোরণ উন্মুখ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
জনগণ আজ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের নির্মম শোষণ ও লুন্ঠন এবং ফ্যাসিস্ট অত্যাচার থেকে মুক্তি চান।
কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ব্যতীত পূর্ববাংলার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, বিডিআর, পুলিশ বাহিনীও এ পুতুল সরকারের প্রতি অসন্তুষ্ট।
কতিপয় বিশ্বাসঘাতক ব্যতীত সরকারী, আধাসরকারী কর্মচারী, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত জনসাধারণও এ পুতুল সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ।
ছাত্র, শিক্ষক, সাহিত্যিক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং অন্যান্য বুদ্ধিজীবীরাও এ সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ।
পূর্ববাংলার শ্রমিক, কৃষক, ক্ষুদে চাকুরীজীবী, জেলে, কামার, কুমার এবং অন্যান্য পেশাধারী জনগণও এ সরকারের প্রতি বিক্ষুব্ধ।
পূর্ববাংলায় বসবসকারী বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু, ধর্মীয়, ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগণও এ ফ্যসিস্ট সরকারের উপর বিক্ষুব্ধ।
অর্থাৎ পূর্ববাংলার সমগ্র জনগণ, শ্রেণী, দল, ভাষা, জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এ সরকারের উপর বিক্ষুব্ধ।
এ পুতুল ফ্যাসিবাদী সরকার এবং তার প্রভু ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের উৎখাতের জন্য পূর্ববাংলার বিভিন্ন স্থানে স্বতস্ফূর্ত সংগ্রাম চালাচ্ছে।
জনগণের এ সংগ্রামকে নেতৃত্ব প্রদানের জন্য জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠন সবচাইতে সময়োপযোগী হয়েছে।

পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট পূর্ববাংলার জনগণের প্রতি আহবান জানাচ্ছেঃ

আপনারা শ্রেণী, স্তর, দল, মত, ভাষা, ধর্ম, জাতি নির্বিশেষে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদান করুন, ভারতীয় সম্পসারণবাদ ও তার তাবেদার বাংলাদেশ পুতুল সরকারকে উৎখাত করুন, জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করুন।
পূর্ববাংলার শ্রমিক শ্রেণীর প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে—আপনারা পূর্ববাংলার সবচাইতে অগ্রগামী শ্রেণী, আপনাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য অক্ষুন্ন রেখে পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনের জন্য জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে যোগদান করুন।
প্রকাশ্যে ও গোপনে কার্যরত পূর্ববাংলার দেশপ্রেমিক বামপন্থীদের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে—আপনারা পূর্ববাংলার জনগণের অংশ। পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামের সাথে আপনাদের সংগ্রাম সমন্বিত করারা জন্য পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদান করুন।
পূর্ববাংলার বিভিন্ন দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল, কর্মী, সহানুভূতিশীল ও সমর্থক যারা পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গনতন্ত্র অর্জন করতে ইচ্ছুক তাদেরকেও আহবান জানানো হচ্ছে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার সংগ্রামী কৃষক জনসাধারণের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, বিডিআর, পুলিশ এবং অন্যান্য সশস্ত্র, আধা সশস্ত্র বাহিনীর দেশপ্রেমিকদের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার দেশপ্রেমিক সরকারী, আধা সরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পের সাথে জড়িতদের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে, জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার ছাত্র-শিক্ষক, সাহিত্যিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবী এবং অন্যান্য পেশাধারী জনগনের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
প্রাক্তন মুক্তি বাহিনী, সৈনিক, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনায় সক্ষম দেশপ্রেমিকদের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার নারীদের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে জাতীয় মুক্তিফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার জাতিগত সংখ্যালঘু, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণের প্রতি আহবান জানানো হচ্ছে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টে যোগদানের জন্য।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট রাজনৈতিক সংগ্রাম, সশস্ত্র সংগ্রাম এবং প্রচার ও কুটনৈতিক সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারকে উৎখাত করার দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করেছে।
পূর্ববাংলার জনগণের সংগ্রামী ঐতিহ্য রয়েছে। তারা সর্বদাই শোষণ-নিপীড়ণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।
অতীতের ঐতিহ্যকে বজায় রেখে পূর্ববাংলার জনগণ অবশই সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে কঠোর সংগ্রামে লেগে থাকবেন, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারকে উৎখাত করে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ববাংলার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবেন।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট পূর্ববাংলার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে নিম্নলিখিত কর্মসূচী বাস্তবায়িত করবে।

►◄

স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ, প্রগতিশীল পূর্ববাংলার প্রজাতন্ত্রের কর্মসূচী

একটি বৃহত্তর ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা কায়েম করা

– পূর্ববাংলার ভূমি থেকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের পরিপূর্ণরূপে উৎখাত করা, তাদের উপনিবেশিক শৃংখল থেকে পূর্ববাংলাকে মুক্ত ও স্বাধীন করা।
পূর্ববাংলাস্থ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের দখলদার সামরিক বাহিনী, আধা সামরিক বাহিনী, উপদেষ্টা, পরামর্শদাতা বা অন্য কোন ছদ্মবেশে পূর্ববাংলার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিয়োজিত সামরিক বা বেসামরিক কর্মচারী, পূর্ববাংলার জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কার্যকলাপে নিয়োজিত ভারতীয় নাগরিকদের উৎখাত করা।
ভারতীয়ও সম্প্রসারণবাদীদের পূর্ববাংলাস্থ সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের তাবেদার দালাল জাতীয় শত্রু এবং ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারকে পরিপূর্ণরূপে উৎখাত করা।
‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার প্রণীত জাতীয় বিশ্বাসঘাতক ফ্যাসিবাদী শাসনতন্ত্র এবং আইন বাতিল করা।
‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার কর্তৃক ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের সাথে স্বাক্ষরিত পূর্ববাংলার জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করা। ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার কর্তৃক ভারতের সাথে সাক্ষরিত গোপন চুক্তিসমূহ বাতিল করা।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের তাবেদার দালাল জাতীয় শত্রুদের মধ্যকার ঘৃণ্য জনগণ বিরোধীদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করা।
– সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে তার নিয়ন্ত্রণাধীন দেশসমূহ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদীদের পূর্ববাংলা থেকে পরিপূর্ণরূপে উৎখাত করা।
তাদের সাথে সম্পাদিত সকল জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিল করা।
পূর্ববাংলাস্থ তাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।
– পূর্ববাংলার ভূমিতে প্রকাশ্য বা গোপন বিদেশী সামরিক ঘাঁটির অবসান করা।
– সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ এবং তার তাবেদার রাষ্ট্রসমূহ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের সামরিক বা বেসামরিক নাগরিক যারা পূর্ববাংলার জাতীয় স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত তাদেরকে উৎখাত করা।
– সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের গোঁড়া প্রতিনিধিদের কঠোরতম শাস্তির ব্যবস্থা করা।
– পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্তের মূলনীতির ভিত্তিতে অবাধ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান, সার্বজনীন প্রত্যক্ষ গোপন ব্যালটের মাধ্যমে সত্যিকার গণতান্ত্রিক উপায়ে পূর্ববাংলার জাতীয় পরিষদ নির্বাচন। জাতীয় পরিষদ হবে পূর্ববাংলার সর্বোচ্চ সংস্থা। এই পরিষদ পূর্ববাংলার সমাজের সকল স্তরের মানুষের মৌলিক অধিকার ও আশা-আকাঙ্খার প্রতিফলন সম্বলিত বৃহত্তর প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের গ্যারান্টিযুক্ত একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করবে।
– বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণী, জাতিগত ও ভাষাগত সংখ্যালঘু, ধর্মীয় সম্প্রদায়, দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক দলসমূহ, জাতীয় মুক্তির সহকারী দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর খাঁটি প্রতিনিধিদের সমবায়ে একটি যৌথ জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকার গঠন।
– বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকারসমূহের স্বীকৃতি ও কায়েম, যথা—বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সমিতিবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক দল গঠনের স্বাধীনতা, ধর্মের স্বাধীনতা ও বিক্ষোভ প্রকাশের স্বাধীনতা।
– সকল নাগরিকের ব্যক্তিগত অধিকারের সুনিশ্চিত গ্যারান্টি দান, বাসস্থানের স্বাধীনতা, চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তা রক্ষা, চলাফেরার স্বাধীনতা, কর্ম ও বিশ্রামের অধিকার এবং শিক্ষার অধিকারের গ্যারান্টি প্রদান।
– নারী ও পুরুষের সমান অধিকার ও বাঙালী জাতি এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্যে সাম্য বিধান।
– দেশপ্রেমিক কার্যের জন্য ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার কর্তৃক আটক সকল বন্দীদের মুক্তি দান।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার কর্তৃক সৃষ্ট সকল প্রকার বন্দী শিবিরের বিলুপ্তি সাধন।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের নির্যাতনে যে সকল দেশপ্রেমিক ব্যক্তি বিদেশে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছেন তাদেরকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও দেশে কাজ করার সুযোগ দান।
– পাকিস্তানে আটক বাঙালীদের ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা।
– ন্যায়সঙ্গতভাবে পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলার সমস্যাবলীর সমাধান করা।
– পূর্ববাংলার সামুদ্রিক জলসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত নির্ধারণ করা। এই জলসীমার মধ্যে মৎস্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ বৈদেশিক কোন শক্তি কর্তৃক লুন্ঠন করা নিষিদ্ধ থাকবে।

মুক্ত মাতৃভূমির প্রতিষ্ঠা ও প্রতিরক্ষার উদ্দেশ্যে

শক্তিশালী পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী গড়ে তোলা
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ এবং তার তাবেদার ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারকে উৎখাতের জন্য গণযুদ্ধের রণনীতি ও রণকৌশল প্রয়োগ করে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা।
– কৃষক, শ্রমিক ও দেশপ্রেমিকদের নিয়ে পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী (নিয়মিত বাহিনী, আঞ্চলিক বাহিনী, গেরিলা ও মিলিশিয়া এবং অন্যান্য বাহিনী) গড়ে তোলা।
তারা মাতৃভুমি ও জনগণের স্বার্থের প্রতি বিশেষ আনুগত্যশীল। পূর্ববাংলার মুক্তি এবং পূর্ববাংলাকে রক্ষার জন্য দেশের সমগ্র জনগণের সাথে কাধে কাধ মিলিয়ে সংগ্রাম করতে এবং এশিয়া তথা সারা বিশ্বে শান্তি রক্ষায় সক্রিয় সাহায্য দানে তারা হবে অঙ্গীকারাবদ্ধ।
– গণযুদ্ধকে জোরদার করতে, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের পরাজিত করতে এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম অব্যাহতভাবে পরিচালনা করে তা চূড়ান্ত বিজয়ের পথে পরিচালনার জন্য দেশপ্রেমিক বাহিনীতে সংগ্রামের কর্মক্ষমতা ও গুণগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি করানো।
– সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনীর দেশপ্রেম, তাদের সংকল্প, শৃংখলাবোধ জোরদার করার উদ্দেশ্যে এবং জনগণ ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক কাজ জোরদার করা।
– দেশপ্রেমিক বাহিনীর অফিসার ও সৈন্যদের ভোটদান করার ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। তার ভূ-সম্পত্তির মালিক হতে পারেন এবং সাধারণ নাগরিকের সকল অধিকার ভোগ করতে পারেন।

একটি স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা
এবং জনগণের জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন

– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের শোষণ ও দাসতের অবসান করা।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের সহযোগী ও সমর্থক বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরদের পূর্ববাংলাস্থ সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা।
– সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের শোষণের অবসান এবং তাদের পূর্ববাংলাস্থ সকল সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা। তাদের দালালদের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করা ।
– স্বাধীন ও আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা, জনগণকে সমৃদ্ধশালী ও দেশকে শক্তিশালী করার মানসে অর্থনৈতিক বিকাশ করা।
– আইনের মাধ্যমে নাগরিকদের সম্পত্তি ও উৎপাদন যন্ত্রের স্বত্বাধিকার সংরক্ষণ, পাক-সামরিক ফ্যাসিস্ট ও তাদের দালালদের দ্বারা উৎখাতকৃত ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের পুনর্বাসন করা। তাদের কাজকর্ম পুনরারম্ভ ও চালিয়ে যাওয়ার জন্য সহজ শর্তে ঋণ দানের ব্যবস্থা করা। ভারতে যায়নি এ অজুহাতে দেশপ্রেমিক ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের উৎখাত প্রতিহত করা। তাদেরকে যথাযথ সুযোগ প্রদান করা। ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার কর্তৃক উৎখাতকৃত দেশপ্রেমিক শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসন করা।
– পূর্ববাংলায় স্বাধীনভাবে ভারী শিল্প, হালকা শিল্প ও কুটির শিল্প গড়ে তোলা। এদেরকে বৈদেশিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার হাত থেকে রক্ষা করা এবং বিদেশের উপর নির্ভরশীল হওয়ার বিরোধিতা করা।
– দেশীয় উৎপাদনকে উৎসাহ দান ও সংরক্ষণের অনুকূলে শুল্ক ব্যবস্থা নির্ধারণ করা। চোরাকারবারী, কালোবাজারী, মহাজনী প্রথা, মুনাফাখোরদের জাতীয় স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ প্রতিহত করা।
– পূর্ববাংলার শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং প্রভৃতি সকল ক্ষেত্রে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের অনুপ্রবেশ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের বিরোধিতা করা।
– পূর্ববাংলা থেকে ভারত ও অন্যান্য রাষ্ট্রে পুঁজি পাচার প্রতিহত করা।
– রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্প ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত মালিকানায় ফেরত দেওয়া প্রতিহত করা।
– শিল্প, ক্ষুদ্র শিল্প, হস্তশিল্পের উন্নয়নে রাষ্ট্র শিল্প ব্যবস্থার সহিত সংশ্লিষ্ট পুঁজিপতিদের উৎসাহিত করবে। জাতি গঠন ও জনকল্যাণ বিধানের সাহায্যকারী শিল্প প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা।
– জেলেদের উপর পরিচালিত শোষণের অবসান করা। তাদের জীবনযাত্রা ও পেশার মানোন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
– শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় শ্রমিক ও কর্মচারীদের অংশগ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ।
– যোগাযোগ ও পরিবহান ব্যবস্থার উন্নয়ন।
– শহর, গ্রাম-সমভূমি ও পার্বত্য এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিময়কে উৎসাহিত ও বৃদ্ধি করা। উত্তরবঙ্গসহ অন্যান্য অনুন্নত অঞ্চলসমূহের দ্রুত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
– ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানদারদের স্বার্থের প্রতি যথাযথ নজর দেওয়া।
– একটি স্টেট ব্যাংক প্রতিষ্ঠা।
– উৎপাদনে উৎসাহ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র অল্প সুদে ঋণদানের নীতি গ্রহণ করবে।
– কৃষি উৎপাদন পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা এবং উহার উন্নয়ন সাধন, কৃষিকার্য ও পশুপালনের উন্নয়ন, মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণ ও তার উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
– ফারাক্কা বাঁধজনিত সমস্যার ন্যায়সঙ্গত সমাধান করা, স্থায়ীভাবে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেচব্যবস্থা, পোকা নিরোধ ও সার প্রদানের ব্যবস্থা করা, কৃষিকে আধুনিকীকরণ করা, রাষ্ট্র কৃষকদিগকে ঐক্যবদ্ধ হতে এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পরস্পরকে সাহায্য করতে উৎসাহিত করবে। গবাদি পশু, কৃষি সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি, বীজ, সার প্রভৃতি ক্রয়ে কৃষকদিগকে স্বল্পসুদে ঋণদান করবে।
– কৃষিকে জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে একে উন্নত করা।
– কৃষিপণ্য বিক্রয়ের সুনিশ্চিত করা। খাদ্যদ্রব্যে দ্রুত আত্মনির্ভরশীল হওয়ার লক্ষ্য অর্জন করা।
– চাল, মাছ, মাংস, ডিম, তরিতরকারী ও অন্যান্য খাদ্যদ্রব্যের পাচার এবং উদ্বৃত্ত নয় এরূপ খাদ্যদ্রব্যের রপ্তানী বন্ধ করা।
– ভারত কর্তৃক পাট ও অন্যান্য কাঁচামাল ক্রয়ের অধিকার বাতিল করা।
– গ্যাস, বিদ্যুৎ প্রভৃতি ভারতে নিয়ে যাওয়া বন্ধ করা।
– ভারতীয় বিদ্যুৎ, তৈল এবং কাঁচামালের উপর শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নির্ভরশীল না করা।
– পারস্পরিক স্বার্থ ও সমতার ভিত্তিতে পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রেখে সকল দেশের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের নিকট থেকে অর্থনৈতিক ও কারিগরি সহযোগিতা গ্রহণ করা।

খোদ কৃষকের হাতে জমি—এই নীতির ভিত্তিতে
ভুমি সংক্রান্ত কর্মসূচির বাস্তবায়ন

– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের দালাল নৃশংস ঝুনা জমিদার এবং তাদের তাবেদার গোষ্ঠীর জমি বাজেয়াপ্ত করে ভূমিহীন এবং কম জমির মালিক কৃষকদের মধ্যে উহা বন্টন।
– কৃষকদের মধ্যে বন্টনকৃত জমির প্রতি তাদের স্বত্বাধিকারের স্বীকৃতি ও উহার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
– রাষ্ট্র ভূ-স্বামীদের নিকট থেকে এলাকা বিশেষে নির্দিষ্ট উচ্চতম সীমার অতিরিক্ত জমি ক্রয়ের ব্যবস্থা করবে। এ সকল জমি ভূমিহীন ও কম জমির মালিক কৃষকদের মধ্যে বন্টন করা হবে। স্থানীয় পরিস্থিতি সাপেক্ষে জমি সংরক্ষণের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারিত হবে। ভূমিহীন ও কম জমির মালিক কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে জমি বন্টন করা হবে। তাদের উপর কোন প্রকার বাধ্যতামূলক শর্তারোপ করা হবে না। যে সকল এলাকায় ভূমি সংস্কারের উপযুক্ত অবস্থা এখনও সৃষ্টি হয়নি তথায় জমির খাজনা হ্রাস করা হবে।
– ইজারাদারী, জোতদারী, মহাজনী ও সুদে বন্ধক সকল জমি, সম্পত্তি বিনা শর্তে পূর্বতন মালিকদের ফেরত দিতে হবে।
– অনুপস্থিত জমিদারদের জমি কৃষকদের নিকট চাষাবাদের জন্য ন্যাস্ত করা এবং তারা এ সকল জমির ফসল ভোগ করবে। পরবর্তীকালে ঐ সকল জমিদারদের প্রত্যেকের রাজনৈতিক মনোভাব বিবেচনা করে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করা হবে।
– জমিদারদিগকে কৃষকদের সংগঠনে অথবা রাষ্ট্রকে জমি দানের সুযোগ দেওয়া হবে। কৃষক সংগঠন অথবা রাষ্ট্র ভূমিহীন কম জমির মালিক কৃষকদের মাঝে এই জমি বন্টন করবে।
– শিল্পে ব্যবহার্য কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী এবং ফলের বাগানের মালিকদিগকে উৎসাহ দেওয়া হবে।
– মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসমূহের ভূমির ন্যায্য স্বত্বাধিকারের প্রতি মর্যদা প্রদান করা।
– ন্যায্য ভিত্তিতে বারোয়াড়ী জমির পুনর্বন্টন।
– যারা জমি উদ্ধার করবে তাদেরকে ঐ উদ্ধারকৃত আবাদী জমির স্বত্বাধিকার প্রদান করা হবে।
– যাদেরকে বন্দী শিবিরে গমনে বাধ্য করা হয়েছে তাদেরকে তাদের সাবেক গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।
– যুদ্ধের ফলে যারা উদ্বাস্তু হয়েছেন, তারা ইচ্ছে করলে তাদের বর্তমান বাসস্থানে বাস করতে পারবেন। তাদের ভূসম্পত্তি ও শ্রমলব্ধ অন্যান্য সম্পত্তির মালিকানা লাভ করবেন। তাদেরকে উক্ত স্থানে বাস করে জীবিকা অর্জনে সাহায্য করা হবে। যারা নিজ জন্মস্থানে ফিরে আসতে চান, তাদের সাহায্যার্থে ব্যবস্থা গৃহীত হবে।

জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শিক্ষার পদ্ধতি গড়ে তোলা,

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন সাধন

সম্প্রসারণবাদী, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী ধরনের হীন মনোবৃত্তি সৃষ্টিকারী ও অধঃপতিত সংস্কৃতি এবং শিক্ষার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। এ সংস্কৃতি আমাদের জনগণের সমৃদ্ধ ও দীর্ঘ ঐতিহ্য সম্পন্ন সংস্কৃতিকে বিনষ্ট করছে।
জাতীয় গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
বিজ্ঞান ও কারিগরি বিদ্যার উন্নয়ন করে উহা জাতি গঠন ও প্রতিরক্ষা কাজে নিয়োজিত করা।
– বৈদেশিক আক্রমণের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণের সংগ্রামী ঐতিহ্য এবং পূর্ববাংলার জনগণের বীরত্বপূর্ণ ইতিহাসের আলোকে জনসাধারণকে শিক্ষাদান, আমাদের জাতীয় সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার, প্রথা সংরক্ষন ও উন্নয়ন।
– জনসাধারণের সাংস্কৃতিক মান উন্নয়ন, নিরক্ষরতা দূর, আনুষাঙ্গিক শিক্ষার উন্নয়ন, নয় সাধারণ শিক্ষার বিদ্যালয়, উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা, বিজ্ঞান কর্মী, কারিগর ও দক্ষ শ্রমিক দল গড়ে তোলা এবং তাদেরকে উচ্চশিক্ষা, ট্রেনিং দানের জন্য সর্বপ্রকার প্রচেষ্টা চালানো।
– বাংলা ভাষাকে উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ।
– শিক্ষা এবং কর্মজীবনে সকল ক্ষেত্রে ভাষাগত সংখ্যালঘুদের নিজ নিজ ভাষা ব্যবহারের সুযোগ প্রদান করা।
দশম শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা, ছাত্রদের শিক্ষা বেতন হ্রাস।
– গরীব ছাত্রদিগকে শিক্ষার বেতন হতে অব্যাহতি দান অথবা তাদের জন্য স্কলারশিপের ব্যবস্থা করা।
– পরীক্ষাসমূহের পদ্ধতির সংস্কার সাধন করা।
– শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছাত্রদের অংশগ্রহণ।
– পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সাহায্যকারী তরুণ ও শিশুদের, বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের পরিবারের সন্তান-সন্ততি ও মেধাবী তরুণদের শিক্ষিত করে তুলতে এবং তাদের প্রতিভার যথাযথ বিকাশ সাধনের জন্য রাষ্ট্র সম্ভাব্য সকল প্রকার সাহায্য দান করবে।
– বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি গবেষণা কার্য পরিচালনা, সাহিত্য ও শিল্পে সৃজনশীল ভূমিকা গ্রহণ এবং সাংস্কৃতিক কর্মে অংশগ্রহণে প্রতিটি নাগরিকের অবাধ সুযোগ দান।
বুদ্ধিজীবী, লেখক, শিল্পী, বৈজ্ঞানিকদিগকে উতসাহিত করা এবং মাতৃভূমি ও জনগণের স্বার্থে তাদের গবেষণা, আবিষ্কার ও সৃজনশীল কাজ অব্যাহত রাখার উপযুক্ত সুযোগের ব্যবস্থা করা।
– যে সকল লেখক, শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীকে তাদের দেশপ্রেমিক ভূমিকার জন্য নির্যাতন ভোগ করতে হয়েছে, তাঁরা যেন তাঁদের সৃজনশীল কর্ম অব্যাহত রাখতে পারেন—এর সুযোগ সৃষ্টি করা।
– স্বাস্থ্য বিভাগের উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্য রক্ষার ও প্রতিষেধক ব্যবহারের আন্দোলন গড়ে তোলা। জনগনের স্বাস্থ্য রক্ষা করা।
– মহামারী নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক শোষকরা যে সকল মারাত্মক রোগ রেখে গেছে সেগুলি বিলোপের ব্যবস্থা করা।
– শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া আন্দোলনের বিকাশ সাধন।
– সমতা ও পারস্পরিক স্বার্থের বৈদেশিক রাষ্ট্রের সাথে সাংস্কৃতিক সম্পর্ক স্থাপন করা।

শ্রমিক, মজুর ও বেসামরিক কর্মচারীদের অধিকার সংরক্ষণ
ও তাদের চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করা

শ্রম আইন প্রণয়ন, আট ঘন্টা শ্রম সময়ের প্রবর্তন, বিশ্রাম ও চিত্তবিনোদনের সুযোগ সৃষ্টি, যুক্তিসঙ্গত বেতন নির্ধারণ এবং বর্ধিত উৎপাদনের জন্য বোনাসের ব্যবস্থা করা। ট্রেড ইউনিয়ন, সমিতিবদ্ধ হওয়া, ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের অধিকার নিশ্চিত করা।
– শ্রমিক, মজদুর ও কর্মচারীদের জীবনযাত্রা ও চাকুরীর উন্নয়ন।
– শিক্ষানবিশদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিক প্রদানের নীতি গ্রহণ।
– শ্রমিক ও শহরেরে দরিদ্র জনসাধারণের জন্য চাকুরীর সংস্থান করা। বেকারত্বের অবসানের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো।
– রোগ, ব্যাধি, কর্মক্ষমতা লোপ, বার্ধক্য ও অবসর গ্রহণ প্রভৃতি কালে শ্রমিক, মজদুর ও কর্মচারীদের যত্ন, সাহায্যদান এবং সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা করা।
– মেহনতী মানুষের বাসস্থানে জীবনযাত্রার অবস্থার উন্নয়ন।
– উভয় পক্ষের আলাপ-আলোচনা ও জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকারের মধ্যস্থতায় শ্রমিক ও মালিকের মধ্যকার বিরোধসমূহের মীমাংসা করা।
– শ্রমিক ও মজদুরদের প্রহার, তাদের বেতন হতে জরিমানা কেটে রাখা এবং অন্যায়ভাবে শ্রমিকদের চাকুরী হতে বহিষ্কার কড়াকড়িভাবে নিষিদ্ধ করা।
– বেসামরিক কর্মচারীদের ভোটদান করার ও নির্বাচিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। তারা সাধারণ নাগরিকের সকল অধিকার ভোগ করতে পারেন।

নারী-পুরুষের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা,
মাতা ও সন্তানদের রক্ষা করা

– জাতীয় মুক্তিসংগ্রামে নারী সমাজের ভূমিকার সাথে যথাযথ সংগতি রেখে তাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৃত্তিগত মানোন্নয়ন, পূর্ববাংলার মহিলাদের বীরত্ব, শৌর্য ও জাতি সেবার ঐতিহ্যের বিকাশ সাধন।
– রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার রয়েছে।
– যে সকল মহিলা পুরুষের অনুরূপ কার্যে নিযুক্ত, তারা সমবেতন, সমমর্যাদা ও সম অধিকার ভোগ করবেন।
– মহিলা শ্রমিক ও বেসামরিক কর্মচারী দুই মাসের জন্য মাতৃত্ব ছুটি লাভ করবেন। মহিলা কর্মীদের উৎকর্ষ বিধান, উপযুক্ত ট্রেনিং ও সক্রিয় সাহায্য দানের নীতি গ্রহণ। বিবাহ ও পরিবার সম্পর্কে প্রগতিশীল আইন প্রণয়ন।
– মাতা ও শিশুদের অধিকার সংরক্ষণ, মাতৃসদন, শিশুমঙ্গল প্রতিষ্ঠান ও নার্সারী স্কুলের সংখ্যা বৃদ্ধি।
– মহিলাদের স্বাস্থ্য ও মর্যাদা হানিকর সকল প্রকার সামাজিক দুর্নীতির অবসান।

শহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের
ব্যবস্থা গ্রহণ করা

– অক্ষম সৈন্যদের অন্ন-বস্ত্রের ব্যবস্থা, জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে যে সকল সৈনিক ও দেশপ্রেমিক বিশেষ কৃতিত্ব প্রদর্শন করবেন তাদেরকে পুরস্কৃত করা।
– মুক্তি সংগ্রামে সশস্ত্র বাহিনী অথবা অন্যান্য বিভাগ ও বিপ্লবী সংগঠনে যে সকল লোক শহীদ হবেন, যারা রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আত্মবলিদান করেছেন, দেশের সমস্ত জনগণ তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাদের স্মৃতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবেন।
– রাষ্ট্র ও জনগণ তাদের পরিবারবর্গের যত্ন নেবেন এবং সাহায্য দান করবেন।
– সশস্ত্র অথবা রাজনৈতিক সংগ্রামে যে সকল দেশপ্রেমিক অক্ষম হয়ে পড়বেন তাদের প্রতি যত্ন নেওয়া হবে এবং তাদেরকে সাহায্য দান করা হবে।
– বিপ্লবে যে সকল পরিবারের অবদান রয়েছে সমগ্র জাতি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তারা সমগ্র জাতিরই সাহায্য ও সহানুভূতি লাভ করবেন।

সামাজিক নিরাপত্তা বিধান,
জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্তদের রিলিফ প্রদান

‘বাংলাদেশ’ ফ্যাসিস্ট সরকারের নীতি বিবর্জিত কাজের ফলে যে সকল ব্যক্তি ও পরিবারের চরম সর্বনাশ হয়েছে, তাদেরকে সমাজে পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও দেশসেবার সুযোগ প্রদান করা।
– অনাথ, বৃদ্ধ, অক্ষম ব্যক্তিদের যত্ন নেয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত বা শস্যহানির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় রিলিফ প্রদানের ব্যবস্থা।
‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের ভাড়াটে সৈন্য ও পুলিশ ও বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যকার অক্ষম, যুদ্ধে নিহত, অসহায় পরিবারের বিষয় বিবেচনা করা।
ভারত থেকে বিতাড়িত বাঙালী, অবাঙালী উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন, জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা এবং সামাজিক অধিকার প্রদান।

‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের ভাড়াটে সৈন্য ও অফিসার এবং পূর্ববাংলায় তাদের প্রশাসনিক বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে যাঁরা জনগনের পক্ষ সমর্থন করবেন তাঁদের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন ও যুদ্ধবন্দীদের প্রতি সদয়্য আচরণ করা

‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকার যে আমলা গোষ্ঠী সৃষ্টি করছে এবং তাদের দ্বারা প্রশাসন পরিচালনা করছে, তাদের মধ্যকার দালালদের উৎখাত করা। ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে যে সকল ঘৃণ্য খুনীরা কাজ করছে তাদের কঠোর শাস্তি বিধান করা।
– ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের ভাড়াটে সৈন্য, অফিসার এবং প্রশাসনিক কর্মচারীরা যাতে ন্যায়ের পথে দেশরক্ষা ও জাতি গঠনের কাজে জনসাধারণের সাথে সামিল হতে পারেন তার অনুকূল অবস্থার সৃষ্টি করা।
– ভাড়াটে বাহিনী ও প্রশাসনিক বিভাগের যে সকল গ্রুপ, ইউনিট অথবা ব্যক্তি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য করবেন তাদেরকে পুরস্কৃত করা হবে এবং দায়িত্বশীল পদে নিযুক্ত করা হবে। যাঁরা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সহানুভুতি ও সমর্থন দান করছেন এবং যাঁরা শাসক গোষ্ঠীর আদেশ পালনে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছেন তাঁদের সকলকে যথাযথ মর্যাদা দান করা হবে।
– যাঁরা ভাড়াটে বাহিনী ত্যাগ করে পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনীতে যোগদানে আবেদন জানাবেন তাঁদেরকে স্বাগত জানানো হবে। তাঁরা সমব্যবহার লাভ করবেন।
– ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের যে সকল কর্মকর্তা পূর্ববাংলার মুক্তির পর জনগণ ও দেশের সেবার নিমিত্তে রাষ্ট্রীয় শাসনযন্ত্রে যোগ দিতে ইচ্ছুক তাঁরাও সমঅধিকার লাভ করবেন।
– ‘বাংলাদেশ’ পুতুল সরকারের ভাড়াটে সৈন্যবাহিনী ও প্রশাসনিক বিভাগের যে সকল ব্যক্তি গণবিরোধী অপরাধে লিপ্ত ছিল, তারা যদি পরিশেষে নিজেদের কার্যকলাপের জন্য আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হয় তবে তাদের ক্ষমা প্রদর্শন করা হবে। যাঁরা উত্তম কার্যাদি দ্বারা নিজেদের অপরাধ স্খলনের প্রয়াস পাবেন, তাঁদেরকে যথারীতি পুরস্কৃত করা হবে।
– ভাড়াটে বাহিনীর বন্দী অফিসার ও সৈন্যদের প্রতি মানবিক ব্যবহার ও অনুকম্পা প্রদর্শন করা হবে।
– ভারতীয় বা অন্য কোন বৈদেশিক রাষ্ট্রের বন্দী সৈনিকদের প্রতি সদয় ব্যবহার করা হবে। এদের মধ্যকার যারা পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রামকে সমর্থন করেন, সময় হলেই তাদেরকে নিজ নিজ পরিবারের নিকট ফিরে যেতে সাহায্য করা হবে।

প্রবাসী বাঙালীদের অধিকার
ও স্বার্থ সংরক্ষণ

– প্রবাসী বাঙালীদের দেশপ্রেমমূলক কার্য এবং জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে তাদের মূল্যবান সাহায্যকে স্বাগত জানানো হবে।
– তাদের অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ করা।
– দেশ গঠনের জন্য প্রবাসী যে সকল বাঙালী দেশে ফিরে আসতে চাইবেন তাদের সাহায্য করা।

পূর্ববাংলায় বসবাসকারী বিদেশী নাগরিকদের
ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ

– পূর্ববাংলার মুক্তি সংগ্রামে স্থানীয় যে সকল বিদেশী নাগরিক সাহায্য করবেন তাদেরকে স্বাগত জানানো হবে।
– পূর্ববাংলায় বসবাসকারী সকল বিদেশী নাগরিকের পূর্ববাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি মর্যাদাশীল হতে হবে এবং তাদেরকে জাতীয় গণতান্ত্রিক সরকারের আইনকানুন মেনে চলতে হবে।
– যে সকল বিদেশী নাগরিক বাংলাদেশ পুতুল সরকার ও তাদের এজেন্টদের এবং ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগিতা দান করেননি, যারা পূর্ববাংলার স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি হানিকর কিছু করবেন না, তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ। যে সকল বিদেশী মুক্তি সংগ্রামকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সমর্থন দান করবেন, তাদের ন্যায্য অধিকার ও স্বার্থের প্রতি যথাযথ লক্ষ্য রাখা।
– পূর্ববাংলার জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত বৈদেশিক এজেন্ট ও চরদের কঠোর শাস্তি বিধান।

পূর্ববাংলার প্রজাতান্ত্রিক সরকার ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের সম্পর্কে নিম্নলিখিত নীতিমালা কার্যকরী করে ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত নিপীড়ণের অবসান করবে

– সকল প্রকার ধর্মীয় নিপীড়নের অবসান করা, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগণের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা, তাদের আচার-অনুষ্ঠান, মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা, গির্জা রক্ষা করা, ক্ষতিগ্রস্তদের সংস্কার করা। ধর্মীয় নিপীড়ক দাঙ্গা, রায়টকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।
ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকুরী, শিক্ষা, শিল্প, প্রতিরক্ষাসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সম অধিকার প্রতিষ্ঠা।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত অনুন্নত অঞ্চলের জন্য বিশেষ এলাকা গঠন করে দ্রুত উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তাদের তাবেদারদের উৎখাত করা, একই সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও তার তাবেদারদের পূর্ববাংলা দখলের চক্রান্ত বিরোধী সংগ্রামে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী জনগণের ঐক্যকে দৃঢ় করা, জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্র অর্জনের সংগ্রামে তাদেরকে শরীক করা।
ঊর্দু ভাষাভাষী জনগণের উপর পরিচালিত নির্মম অত্যাচারের অবসান করা, তাদের জীবিকা নির্বাহের ব্যবস্থা করা, নাগরিক অধিকার প্রদান করা, তাদের আচার-ব্যবহার ও সংস্কৃতি রক্ষা করা।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার দালালদের বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু জনগণকে বিভক্ত করা ও শোষণ করার জন্য ব্যবহৃত সকল আইন, পদ্ধতি, নীতি ও কৌশল বাতিল করা, জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতি অসম আচরণ এবং তাদেরকে ভয় দেখিয়ে কূটকৌশলে এবং বলপ্রয়োগ করে বাসস্থান থেকে উৎখাত করাকে বিরোধিতা করা।
– বিভিন্ন ভ্রাতৃপ্রতিম জাতিসত্বার মধ্যকার এবং তাদের সাথে বাঙালী জাতির দীর্ঘদিনের একতা এবং পারস্পরিক সাহায্যের ঐতিহ্যকে বিকাশ করা, যাতে দেশকে রক্ষা এবং দেশ গঠনের কাজে সকলকে শরীক করা যায়।
চাকুরী, শিল্প, ব্যবসা-বানিজ্য, প্রশাসন, প্রতিরক্ষা ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে সকল জাতিসত্বার সম অধিকার রয়েছে।
– জাতিগত সংখ্যালঘুদের যে সমস্ত জমি ও সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করা ও বন্দোবস্ত নেওয়া হয়েছে তা পূর্বতন মালিককে ফেরত দিতে হবে।
ইজারাদারী, জোতদারী ও মহাজনী সুদে বন্ধক সকল জমি, সম্পত্তি বিনাশর্তে পূর্বতন মালিকদের ফেরত দিতে হবে।
– সরকারী সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাসকারী ঝুমিয়া চাষীদের উপর ভূমিদাসসুলভ শোষণ, নিপীড়ণ ও নির্যাতনের অবসান ঘটাতে হবে।
– জাতিগত সংখ্যালঘু কৃষকদের মাঝে ‘যে ভূমি চাষ করে সে-ই ভূমির মালিক’ এই কৃষিনীতির সুযোগ দান করা।
– কাপ্তাই বাঁধের জল কৃষিকাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করে এলাকা প্লাবিত না করে—বিশেষজ্ঞ দ্বারা স্থিরীকৃত এরূপ সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া।
– জাতিগত সংখ্যালঘু জেলেদের উপর ঠিকাদারী, সরকারী কর্মচারী ও তাদের তাবেদারদের শোষণ বন্ধ করতে হবে। তাদেরকে মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জাম ন্যায্যমূল্যে সরবরাহ করতে হবে। ন্যায্যমূল্যে মৎস্য ক্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
– জাতিগত সংখ্যালঘুদের স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য উৎসাহিত করা, তাদের ভূমির উন্নতি সাধন করা, তাদের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি এবং তাদের জীবন ধারণের মানকে উন্নত করা, যাতে তারা পূর্ববাংলার জনগণের সাধারণ জীবন ধারণের মান পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।
– জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিজেদের কথা ও লিখিত ভাষার (লিখিত ভাষা না থাকলে তার ব্যবস্থা করা) মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি ও শিল্পকলার বিকাশ, তাদের নিজস্ব আচার-অনুষ্ঠান বজায় রাখা বা পরিবর্তন করার অধিকার নিশ্চিত করা।
– জাতিগত সংখ্যালঘুদের মধ্য থেকে দ্রুত প্রশাসনিক কর্মচারী শিক্ষিত করা, যাতে তারা অল্প সময়ের মাঝে নিজেদের স্থানীয় বিষয় নিজেরাই পরিচালনা করতে পারে।
– জাতিগত সংখ্যালঘুদের জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক অধিকার বাস্তবায়িত করা।
– স্বাধীন ও মুক্ত পূর্ববাংলার মধ্যে বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য স্বায়ত্বশাসিত এলাকা গঠন ও আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন প্রদান, যাতে তাদের জাতিগত বিকাশ ত্বরান্বিত হয়।
– তাদের সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহার রক্ষা করা।

শান্তি ও নিরপেক্ষতার বৈদেশিক নীতি

পূর্ববাংলার গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র শান্তি ও নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি অনুসরণ করবে। এই বৈদেশিক নীতিতে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ঐক্য ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার নিশ্চয়তা রয়েছে এবং ইহা বিশ্বশান্তির সহায়ক। এই বৈদেশিক নীতি নিম্নরূপঃ
পরস্পরের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন, পরস্পরের আভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, পরস্পর অনাক্রমণ, পারস্পরিক সমতা ও স্বার্থ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থানের ভিত্তিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্বিশেষে সকল দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন।
পূর্ববাংলার জনগণের অধিকাংশের আশা-আকাঙ্খার সাথে সংগতিপূর্ণ এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলার সম্পর্কের সমস্যার (পাকিস্তানের সাথে পূর্ববাংলার রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক, পাকিস্তানস্থ বাঙালীদের ফিরিয়ে আনা, পূর্ববাংলার গণহত্যা ও ফ্যাসিস্ট ধ্বংসযজ্ঞের অপরাধে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও সামরিক-বেসামরিক ব্যক্তিদের বিচার ও শাস্তি প্রদান, পূর্ববাংলা থেকে গত ২৪ বছরে পাকিস্তানে যে পুঁজি ও মূল্যবান সম্পদ পাচার হয়েছে তা সুদসহ ফেরত আনা, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের সমস্যা, পূর্ববাংলায় তারা যে নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা, ধর্ষণ, লুন্ঠন চালিয়েছে তার যথাযথ ক্ষতিপুরণ আদায় করা ইত্যাদি সমস্যা) সমাধান করা।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে যে সকল দেশ সাহায্য-সহযোগিতা ও সমর্থন দান করবেন তাদের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থকে মর্যাদা দান।
কোনরূপ রাজনৈতিক শর্ত জড়িত না ত্থাকলে যে কোন দেশের কারিগতি ও অর্থনৈতিক সাহায্য গ্রহণ।
কোনরূপ সামরিক চক্তিতে জড়িত না হওয়া, পূর্ববাংলায় কোনরূপ বিদেশী শক্তির কোনরূপ সামরিক বাহিনী অথবা সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্ব না রাখা।
– পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে যে সকল দেশ সাহায্য-সহযোগিতা ও সহানুভূতি জানাবেন তদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সমর্ক জোরদার করা।
– ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী সংগ্রামরত দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের সংগ্রাম, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার দেশ, জাতি ও জনগণের মুক্তি আন্দোলনের প্রতি সক্রিয় সমর্থন জ্ঞাপন।
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, প্যালেস্টাইন এবং অন্যান্য দেশের জনগণের মহান সংগ্রামকে সমর্থন করা।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ বিরোধী ভারতীয় জনগণের সংগ্রাম সমর্থন করা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফ্রো-আমেরিকানদের মৌলিক জাতীয় অধিকারের ন্যায্য সংগ্রামের প্রতি সক্রিয় সমর্থন দান করা।
– বিশ্বশান্তি রক্ষার কাজে সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে পররাষ্ট্রলোভী সাম্রাজ্যবাদী গোষ্ঠীকে প্রতিহত করতে এবং তাদের আক্রমণাত্মক সামরিক জোট ও বৈদেশিক সামরিক ঘাঁটি বিলোপের কাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা।
– সকল আন্তর্জাতিক গণসংগঠন এবং ভারত, সোভিয়েট ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনতাসহ বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক জনসাধারণের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি ও সুদৃঢ় করার জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালানো।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য পূর্ববাংলার জনগণের সমর্থনে বিশ্বব্যাপী গণফ্রণ্টের সম্প্রসারণ ও সুসংহতকরণের উদ্দেশ্যে কাজ করে যাওয়া।
পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম শুধু যে আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যত বংশধরদের ভাগ্য নির্ধারণের জন্য পরিচালিত হচ্ছে তা নয়, সমগ্র বিশ্বের জনগণ যারা শান্তি, জাতীয় স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র কায়েম করার জন্য সংগ্রামরত তাদের স্বার্থও এর সাথে জড়িত। এই মহান গৌরবময় উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়িত করার জন্য পূর্ববাংলার জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছেন।
এ ঐক্যকে অবশ্যই আরো দৃঢ় ও সম্প্রসারিত করতে হবে।
যে সকল রাজনৈতিক দল, সংগঠন ও প্রগতিশীল ব্যক্তি পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের কর্মসূচী সমর্থন করবেন, ফ্রন্ট আন্তরিকভাবে তাদের অভিনন্দন জ্ঞাপন করবে এবং তাদের সাথে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে প্রস্তুত।
পূর্ববাংলার জাতীয় বিশ্বাসঘাতক ও ফ্যাসিস্ট শাসকগোষ্ঠী যতই ঘৃণ্য, উন্মত্ত নৃশংস একগুয়ে কার্যকলাপ চালিয়ে যাক না কেন, তাদের পরাজয় অবধারিত।
আসুন, আমরা আমাদের মাতৃভূমির স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হই, এ একতাকে জোরদার করি, বিজয়ের পথে অগ্রসর হই, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার বিশ্বাসঘাতক ও ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে পরাজিত করি।
পূর্ববাংলার জনগণের বিজয় অবধারিত। পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট পূর্ববাংলায় গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উপরিউক্ত মহান কর্মসূচী অবশ্যই বাস্তবায়িত করবে।
পূর্ববাংলার জাতীয় বিশ্বাসঘাতক ও ফ্যাসিস্ট শাসক গোষ্ঠী ও তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম ন্যায়ের সংগ্রাম। সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকান দেশসমূহের জনগণ, ভারত-সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ অবশ্যই পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিসংগ্রামকে সাহায্য, সহানুভূতি ও সমর্থন দান করবেন।

আমাদের চূড়ান্ত বিজয় অবশ্যম্ভাবী।