সিরাজ সিকদার রচনাঃ পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কতিপয় সমস্যা (৩০ এপ্রিল ১৯৭৪)

সিরাজ সিকদার রচনা

পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার কতিপয় সমস্যা

(৩০ এপ্রিল ১৯৭৪)

sikder

(৩০শে এপ্রিল বিবৃতি হিসেবে খ্যাত এই দলিলটি অন্যতম প্রধান একটি সিরাজ সিকদার রচনা যা পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনীর তৃতীয় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এর সর্বোচ্চ পরিচালক মণ্ডলীর বিবৃতি হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল—সর্বহারা পথ)

১।। ভূমিকা

১৯৭১ সালের ৩০শে এপ্রিল বরিশালের পেয়ারা বাগানে (বরিশাল সদর, বানারীপাড়া, ঝালকাঠি, কাউখালি, স্বরূপকাঠি থানার সীমান্তবর্তী আটঘর, কুড়িয়ানা, ভীমরুলী, ডুমুরিয়া এবং অন্যান্য গ্রাম) পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি সংগঠন পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের নেতৃত্বে একটি নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠে।
এভাবে পূর্ববাংলার ইতিহাসে সর্বপ্রথম সর্বহারা বিপ্লবীদের নেতৃত্বে একটি নিয়মিত সশস্ত্র বাহিনী গড়ে উঠে।
কমরেড সিরাজ সিকদারের সরাসরি পরিচালনায় ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে এ বাহিনী গড়ে উঠে। এ সশস্ত্র বাহিনী এমন একটি সময় গড়ে উঠে যখন পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের প্রচণ্ড রণনৈতিক আক্রমণের মুখে আওয়ামী বিশ্বাসঘাতকদের সকল প্রতিরোধ ভেঙ্গে পড়ে, তারা পূর্ববাংলার জনগণকে অসহায় অবস্থায় রেখে গা বাঁচানোর জন্য ভারতে পলায়ন করে।
পূর্ববাংলায় পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের প্রতিরোধ করার মতো কোন শক্তিই তখন অবশিষ্ট ছিল না।
এ সময় পেয়ারা বাগানের মুক্তি বাহিনী বীরত্বের সাথে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে এবং পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে বিরাট প্রতিরোধ গড়ে তোলে, বিশাল এলাকা মুক্ত করে ঘাঁটি এলাকা স্থাপন করে, সশস্ত্র সংগ্রাম, জনগণকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করে, জনগণের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে আনে।
এ সশস্ত্র সংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ৩রা জুন, ১৯৭১ সালে গড়ে উঠে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে পেয়ারা বাগানে সশস্ত্র তৎপরতার ঐতিহ্য অনুসরণ করে গড়ে উঠেছে পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী।
পূর্ববাংলার শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করে পূর্ববাংলার জনগণকে মুক্ত করার জন্য সর্বহারা পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহতভাবে চালিয়ে যাচ্ছে।
এ প্রক্রিয়ায় অর্জিত হয়েছে অতিশয় মূল্যবান অভিজ্ঞতা যা আমাদেরকে সশস্ত্র সংগ্রাম, পার্টি গড়ে তোলা ও জনগণকে পরিচালনা করতে সক্ষম করে তুলেছে।

২।। জনগণের সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ, পূর্ববাংলার জনগণের উপর নির্মম শোষণ ও নিপীড়ন চালাচ্ছে। তারা পূর্ববাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক, পূর্ববাংলার রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতি তাদের দখলে ।
পূর্ববাংলার উৎপাদন ব্যবস্থার উপর থেকে এদের মালিকানা উৎখাত করে জনগণ নিজেদের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।
জনগণের এ প্রচেষ্টায় বাধা দিচ্ছে উৎপাদন ব্যবস্থার মালিকরা। তারা উপরিকাঠামো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী দ্বারা জনগণকে দাবিয়ে রাখছে, নিজেদেরকে রক্ষা করছে।
কাজেই আমাদেরকে সংগ্রাম পরিচালনা করতে হচ্ছে উপরিকাঠামোর বিরুদ্ধে প্রধারতঃ রাষ্ট্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে।
কাজেই সশস্ত্র বাহিনীকে পরাজিত করে পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্রকে ধ্বংস করতে হবে। জনগণের স্বার্থরক্ষা এবং শত্রুদের দাবিয়ে রাখার জন্য নতুন রাষ্ট্রযন্ত্র, তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
এভাবে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে হবে।
এ নতুন রাষ্ট্রযন্ত্রের সাহায্যে জনগণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদন সম্পর্ক কায়েম করতে হবে।
প্রতিক্রিয়াশীলদের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনীকে পরাজিত ও ধ্বংস করে পুরানো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চূর্ণ বিচূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী।
যেহেতু আমাদের কোন সশস্ত্র বাহিনী নেই, তাই উদ্ভব হয় সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার সমস্যা ।
জনগণের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ উৎপাদনের সম্পর্ক স্থাপন করতে হলে জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দালালদের উৎখাত করতে হবে।
গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে সামন্তবাদকে উৎখাত করতে হবে।
পূর্ববাংলার জাতীয় ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে জাতীয় বিপ্লব প্রধান। কারণ দল, মত, জাতি, ধর্ম ও শ্রেণী নির্বিশেষে পূর্ববাংলার সকল জনগণ ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার আওয়ামী লীগ বিশ্বাসঘাতকদের উৎখাত চান।
এ কারণে পূর্ববাংলার বিপ্লবী যুদ্ধের বর্তমান রূপ হচ্ছে জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।
এ জাতীয় বিপ্লব এবং জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্যসমূহ ধাপে ধাপে পূরণ করতে হবে।
সামন্তদের উৎখাত, তাদের ভূমি ক্ষেতমজুর-গরীব চাষীদের মাঝে বিতরণ, দেশপ্রেমিক সামন্তদের সুদ-বর্গা হ্রাস, নির্দিষ্ট সীমার অধিক ভূমি বিতরণ ইত্যাদি ভূমি সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
এর ফলে গ্রামের কৃষক সাধারণকে বিপ্লবের পক্ষে টেনে আনা ও পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
এভাবে জাতীয় বিপ্লব ও গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সমন্বয় সাধন করতে হবে।
মনিসিং-মোজাফফর সংশোধনবাদীরা পার্লামেন্টারী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনার কথা বলছে। এভাবে তারা জনগণ ও সর্বহারা বিপ্লবীদের ধোকা দিচ্ছে, প্রতিক্রিয়াশীলদের টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
নয়া সংশোধানবাদীরা সময় হয়নি, সংগঠন হয়নি ইত্যাদি অজুহাতে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের বিরোধিতা করে এসেছে। তারা বামপন্থী হটকারী লাইন বা ডানপন্থী সুবিধাবাদী লাইন অনুসরণ করে সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়াকে বিঘ্নিত করেছে।
পূর্র্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে পূর্ববাংলার সর্বহারা পাটির সাথে যুক্ত সর্বহারা বিপ্লবীরা বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে বিরামহীন সংগ্রাম পরিচালনা করে। জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করার জন্য সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রতি সর্বদাই যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করে।

৩।। পূর্ববাংলার বিপ্লবী যুদ্ধ ও বিভিন্ন শ্রেণীর ভূমিকা

পূর্ববাংলার বিপ্লবের শত্রু হচ্ছে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদ এবং তাদের উপর নির্ভরশীল প্রতিক্রিয়াশীল বুদ্ধিজীবীরা।
পূর্ববাংলার বুর্জোয়া শ্রেণী ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের উপর নিভর করে ১৯৭১-এ সশস্ত্র প্রতিরোধ চালায়। সশস্ত্র প্রতিরোধ ভেঙ্গে গেলে তারা ভারতে পলায়ন করে । শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ও গদির লোভে মীরজাফরের মত পূর্ববাংলাকে তারা ভারতের নিকট বন্ধক দেয়।
ভারতীয় বাহিনী পাক সামরিক দস্যুদের পরাজিত করে পূর্ববাংলা দখল করে এবং এখানে তার উপনিবেশ কায়েম করে। তারা আওয়ামী বিশ্বাসঘাতকদের দ্বারা পুতুল সরকার গঠন করে।
এ থেকে দেখা যায় কোন কোন ঐতিহাসিক মুহুর্তে বুর্জোয়া শ্রেণী জাতীয় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে। কিন্তু তারা নিজেদের স্বার্থপরতা এবং অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অভাবের কারণে বিপ্লবী যুদ্ধকে পূর্ণ বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে অনিচ্ছুক ও অক্ষম।
কৃষক ও ক্ষুদে বুর্জোয়া জনগণ সক্রিয়ভাবে বিপ্লবী যুদ্ধে যোগদান করতে এবং সে যুদ্ধকে পূর্ণ বিজয় পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছুক। তারাই হচ্ছে বিপ্লবী যুদ্ধের প্রধান শক্তি। কিন্তু ক্ষুদে উৎপাদনের বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের রাজনৈতিক দৃষ্টি গণ্ডিবদ্ধ (আবার কিছু সংখ্যক বেকার জনসাধারণের নৈরাজ্যবাদী ভাবধারা আছে)।
চিন্তা ও কাজের ক্ষেত্রে তারা একতরফাবাদ, ভাসাভাসা ভাব এবং আত্মগত ভাব দ্বারা পরিচালিত।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তারা হয় ডানে-বামে দোদূল্যমান। সামরিক ক্ষেত্রে তারা হয় রক্ষনশীল বা হঠকারী।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রে তারা হয় বিভেদপন্থী ও উপদলবাদী।
কাজেই এদের নেতৃত্বে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা ও তাকে জয়যুক্ত করা কখনোই সম্ভব নয়। তারা বিপ্লবী যুদ্ধের নির্ভুল পরিচালক হতে পারেনা।
এ কারণে যে যুগে সর্বহারা শ্রেণী রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে ইতিমধ্যেই আত্মপ্রকাশ করেছে, সে যুগে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্ব অনিবার্যরূপেই এসে পড়ে সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির কাঁধে। এ সময় কোন যুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বের অভাব ঘটলে অথবা সেই নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গেলে সে যুদ্ধ অনিবার্যভাবেই ব্যর্থ হবে।
কারণ পূর্ববাংলার সমাজের সকল স্তর ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে শুধুমাত্র সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টিই হচ্ছে সংকীর্ণতা ও স্বার্থপরতা থেকে সবচেয়ে মুক্ত; রাজনীতিগতভাবে তারাই হচ্ছে সবচেয়ে বেশী দূরদৃষ্টি সম্পন্ন; সবচেয়ে বেশী সংগঠিত আর দুনিয়ার অগ্রগামী সর্বহারা শ্রেণী ও রাজনৈতিক পার্টিগুলোর অভিজ্ঞতাকে তারাই সবচাইতে বিনয়ের সাথে গ্রহণ করতে এবং সেই অভিজ্ঞতাকে নিজেদের কার্যে প্রয়োগ করতে সক্ষম ।
তাই কেবলমাত্র সর্বহারা শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টিই কৃষক, ক্ষুদে বুর্জোয়া ও বুর্জোয়া শ্রেণীর সংকীর্ণতা, বেকার জনসাধারণের ধ্বংসাত্মকতাকে আর বুর্জোয়া শ্রেণীর দোটানা মনোভাব ও শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবার মনোবলের অভাবকে অতিক্রম করতে পারে (অবশ্যই যদি পার্টির নীতিতে ভূল না হয়)। এবং বিপ্লব ও যুদ্ধকে বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে আভ্যন্তরীণ ক্ষুদে বুর্জোয়াদের মতাদর্শগত পুনর্গঠন চালানো এবং সংশোধনবাদী ও শত্রুচরদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হবে, বাইরের ক্ষুদে বুর্জোয়া, বুর্জোয়া এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে নিজ নেতৃত্বে অন্যান্য শ্রেণীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য জাতীয় মুক্তি ফ্রন্ট গঠন করতে হবে, জাতিভিত্তিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসাথে অন্যান্য শ্রেণীর অক্ষমতা, অদৃঢ়তা, বিপ্লব পরিচালনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে এরূপ অন্যান্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সর্বদা সংগ্রাম করতে হবে।
সঠিক রাজনৈতিক লাইন যার ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগ্রামে পরিচালনা করা যায় তা হচ্ছে মৌলিক গুরুত্ব সম্পন্ন।
শুধু রাজনৈতিক লাইন নয়, সামরিক, সাংগঠনিক, মতদর্শগত ও অন্যান্য লাইনও সঠিক হতে হবে।
লাইন সঠিক হলে ক্ষুদ্র শক্তি বড় হয়, সশস্ত্র শক্তি না থাকলে তা গড়ে উঠে, রাজনৈতিক ক্ষমতা না থাকলে তা অর্জিত হয়। লাইন ভুল হলে পূর্ব অর্জিত ফল খোয়া যায়।
কাজেই সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিকে সক্ষম হতে হবে রাজনৈতিক, সামরিক, সাংগঠনিক, মতাদর্শগত ও অন্যান্য লাইন সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে এবং তা বাস্তবায়নে কেডার, সৈনিক ও জনগণকে পরিচালনা করতে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি জনগণকে সমাবেশিত ও তাদের উপর নির্ভর করে জাতীয় বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করছে।
এ কারণেই এ যুদ্ধ হচ্ছে গণযুদ্ধ।
একমাত্র পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি গণযুদ্ধ পরিচালনা করে শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করতে সক্ষম।

৪।। পূর্ববাংলার সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী হচ্ছে সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের বাহিনী

শ্রেণী সমাজে প্রতিটি সংগঠনই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর সেবা করে।
সশস্ত্র সংগঠনও একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর স্বার্থের সেবা করে।
সমাজের শ্রেণী বিভাগের পর রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনীর উদ্ভব হয় ক্ষমতাসীন শ্রেণীকে টিকিয়ে রাখার জন্য।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বি.ডি.আর, রক্ষী ও পুলিশ বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য হচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার প্রভুদের টিকিয়ে রাখা।
প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণী নিজেদের রক্ষা করা এবং জনগণকে দাবিয়ে রাখার জন্য যে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছে তাকে পরাজিত ও ধ্বংস করা এবং সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের রাষ্ট্রক্ষমতা কায়েম ও রক্ষা করা এবং শত্রুদের দাবিয়ে রাখাই সশস্ত্র দেশপ্রেমিক বাহিনী গঠনের উদ্দেশ্য।
কাজেই সশস্ত্র বাহিনী একটি নির্দিষ্ট শ্রেণী ও তার রাজনৈতিক পার্টির অধীনে থাকে, তাদের স্বার্থের সেবা করে।
শ্রেণীর ঊর্ধ্বে, রাজনীতির উর্ধ্বে কোন সশস্ত্রবাহিনী থাকতে পারেনা।
সশস্ত্রবাহিনী সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ব ব্যতিরেকেই গড়ে তুললে তা কি জনগণের স্বার্থের সেবা করতে পারে?
সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে না তুললে অনিবার্যভাবেই সশস্ত্র বাহিনী তার সদস্যদের শ্রেণীভিত্তিকেই সেবা করবে।
সশস্ত্র বাহিনীতে সর্বহারা পার্টির নেতৃত্ব না থাকায় সেখানে ঢুকে পড়বে আমলা বুর্জোয়া, সামন্ত, ক্ষুদে বুর্জোয়া এবং তাদের শ্রেণী পরিবর্তনেরও কোন প্রয়োজন হবে না।
ফলে এ বাহিনী আমলা বুর্জোয়া, সামন্ত, ক্ষুদে বুর্জোয়াদের স্বার্থরক্ষা করবে, সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের স্বার্থরক্ষা করবে না।
এ বাহিনী হবে প্রতিক্রিয়াশীল সমরবাদী বাহিনী।
পক্ষান্তরে আমাদের বাহিনী সর্বহারাশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে, সদস্যরা সর্বহারায় রূপান্তরিত হচ্ছে; পার্টি সশস্ত্র বাহিনীকে নেতৃত্ব দিচ্ছে ও পরিচালিত করছে।
বর্তমান যুগে কেবলমাত্র সর্বহারা শ্রেণীই জনগণের স্বার্থরক্ষা করতে সক্ষম, তাদেরকে শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত ও মুক্ত করতে সক্ষম।
এ কারণে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্রবাহিনী সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের স্বার্থরক্ষা করে।
সৈন্যবাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কোম্পানী পর্যায়ে পার্টি শাখা প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক কমিশার নিয়োগ, প্রতিটি সেনাবাহিনী স্থানীয় সংগঠনের অধীন ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে পার্টি-নেতৃত্ব প্রদান করা, বন্দুক পার্টির অধীন, পার্টি বন্দুকের অধীন নয়—এ নীতি কার্যকরী হচ্ছে।

৫।। পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা ও বিপ্লবী যুদ্ধের নীতি ও কৌশল

পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এরূপ সকল নীতি ও কৌশল ব্যর্থ হতে বাধ্য।
কোন বৈদেশিক অভিজ্ঞতা যা আমাদের বাস্তব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় তা অন্ধভাবে হুবহু প্রয়োগ করলে ব্যর্থ হতে বাধ্য।
পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা কি?
পূর্ববাংলা একটি ক্ষুদ্র দেশ, জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্যভূমি খুবই কম, নদীমাতৃক সমভূমিই বেশী। ভৌগলিকভাবে পূর্ববাংলা ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত, সমুদ্রও ভারত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এছাড়া আমাদের সাহায্য করতে পারে এরূপ দেশের সাথে পূর্ববাংলার কোন সীমান্ত নেই।
জনগণের রয়েছে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অভিন্নতা। অর্থনৈতিকভাবে পূর্ববাংলা সমবিকশিত। জনগণ বাংলাদেশ পুতুল সরকার ও তার প্রভুদের উৎখাত চান।
বিভিন্ন বেসামরিক বাহিনী ছাড়াও বাংলাদেশ পুতুল সরকারের রয়েছে পুলিশ, বি.ডি.আর, রক্ষী এবং সেনাবাহিনী। এদেরকে সহায়তা করার জন্য রয়েছে ভারতীয় বাহিনী, সোভিয়েত এবং সম্ভবতঃ মার্কিন বাহিনীও।
পক্ষান্তরে পূর্ববাংলার জনগণকে মুক্ত করার ও রক্ষা করার মত কোন শক্তিশালী বাহিনী আমাদের নেই।
শত্রুদের উৎখাতের জন্য জনগণের রয়েছে দৃঢ় মনোবল। এখানেই নিহিত আছে শূন্য থেকে জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার ভিত্তি।
আমাদের গেরিলা বাহিনী শূন্য থেকে গড়ে উঠেছে, তারা অনভিজ্ঞ, নতুন। তাদের অস্ত্র-শস্ত্র স্বল্প, নিয়মিত সরবরাহ নেই, তাদের ট্রেনিং নেই।
পক্ষান্তরে শত্রুসেনা অভিজ্ঞ, ট্রেনিং প্রাপ্ত, সংখ্যায় বেশী, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তা রয়েছে তাদের পিছনে। পূর্ববাংলার ভৌগলিক সুবিধা তাদের পক্ষে।
তাদের সাহায্য করার জন্য রয়েছে ভারতীয় বাহিনী, সোভিয়েত ও সম্ভবতঃ মার্কিন বাহিনী।
কাজেই শত্রু প্রবল, আমরা দুর্বল। এ কারণে শত্রুকে পরাজিত করতে সুদীর্ঘদিন যুদ্ধ চালাতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের দুর্বল শক্তি সবল শক্তিতে রূপান্তরিত হবে; পক্ষান্তরে শত্রুর সবল শক্তি দুর্বল শক্তিতে রূপান্তরিত হবে, তারা পরাজিত ও ধ্বংস হবে।
এ কারণে আমাদের যুদ্ধের রণনীতি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ।
কিন্তু বাস্তব যুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা যদি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের নীতি গ্রহণ করি, ঘন্টার পর ঘন্টা শত্রুর সাথে লড়াই করি তবে শত্রু সহজেই শক্তি সমাবেশ করে আমাদের ধ্বংস করতে সক্ষম হবে।
কাজেই বাস্তব যুদ্ধ ও লড়াই হতে হবে দ্রুত নিষ্পত্তিকর যুদ্ধ, অর্থাৎ অতি অল্প সময়ের মাঝে আমাদের লড়াই শেষ করতে হবে যাতে শত্রু তার শক্তি সমাবেশ করার সময় না পায়।
এ দ্রুত নিষ্পত্তিকর যুদ্ধ সাধারণতঃ অতর্কিত হামলার রূপ গ্রহণ করবে। এর ফলে শত্রু তার শক্তি, উৎকৃষ্টতা ব্যবহার করতে পারবেনা। সে অপস্তুত অবস্থায় থাকবে, এমন কি সে অস্ত্র ব্যবহারও করতে সক্ষম হবে না।
উদাহরণ স্বরূপ, ১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের অতর্কিত আক্রমণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াইয়ের কৌশলের কারণে বহু থানা ও ফাঁড়ি দখল করা সম্ভব হয়। অনেক ক্ষেত্রে শত্রু অস্ত্র ব্যবহারেরও সুযোগ পায়নি।
আমাদের রণনীতি হচ্ছে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাঝে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই করা।
আমাদের শক্তি দুর্বল, শত্রু শক্তি প্রবল, সে যেখানেই আমাদের খোঁজ পায় সেখানেই তার শক্তি সমাবেশ করে আমাদেরকে আক্রমণ করে।
অর্থাৎ শত্রু রণনৈতিক আক্রমণের স্তরে রয়েছে। আর আমরা রয়েছি রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তরে, নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখা ও বিকাশ সাধনের স্তরে।
কিন্তু আমাদের বাস্তব হামলার রূপ হচ্ছে আক্রমণাত্মক। অর্থাৎ শত্রুদের আমরাই আক্রমণ করি, শত্রু আত্মরক্ষায় থাকে।
নিছক আত্মরক্ষার জন্য যুদ্ধ করলে শক্তিশালী শত্রুর দ্বারা আমরা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাব।
অবশ্য শত্রুর কোন অংশকে ঠেকিয়ে রাখা, বিচ্ছিন্ন শত্রুকে ঘিরে রাখা ইত্যাদির জন্য আমরা কৌশলগত আত্মরক্ষাত্মক পদক্ষেপ নেই।
কাজেই আমাদের রণনীতি হচ্ছে রণনৈতিক আত্মরক্ষার মাঝে আক্রমণ চালানো।
শত্রু অধিকৃত দেশ হচ্ছে বাংলাশে। সে যে কোন স্থানে শক্তি সমাবেশ করে আমাদেরকে আক্রমণ করতে পারে।
অর্থাৎ শত্রু রণনৈতিক বহির্লাইনে রয়েছে।
পক্ষান্তরে আমরা আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করছি। অর্থাৎ আমরা রণনৈতিক অন্তর্লাইনে লড়ছি। বাস্তব হামলায় আমরা করি আক্রমণ অর্থাৎ বহির্লাইনে তৎপরতা চালাই, যদিও আমাদের বহির্লাইনের ঘেরাও বলয় ছোট (একটি থানা, ফাঁড়ি বা ছোট চলমান ইউনিট)।
কাজেই আমরা অন্তর্লাইনের মাঝে বহির্লাইনে লড়াই করছি।
আমাদের যুদ্ধের নীতি হচ্ছেঃ
রণনৈতিক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের মাঝে দ্রুত নিষ্পত্তির লড়াই করা, রণনৈতিক আত্মরক্ষার মাঝে আক্রমণাত্মক লড়াই করা, অন্তর্লাইনের মাঝে বহির্লাইনের লড়াই করা।
এ যুদ্ধ আমাদের ততদিন চালাতে হবে যতদিন শত্রু তার রণনৈতিক আক্রমণ চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে। শত্রু রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তরে পৌঁছাবে আর আমরা শত্রুর বিরুদ্ধে রণনৈতিক আক্রমণ চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত ও উৎখাত করতে সক্ষম হবো।
রণনৈতিক আত্মরক্ষার স্তর থেকে দেশব্যাপী রণনৈতিক আক্রমণ পরিচালার স্তরে পৌঁছাবার সময়টা হচ্ছে গেরিলা যুদ্ধের সবচাইতে কঠিন, নির্মম ও দীর্ঘদিনের স্তর।

৬।। পেয়ারা বাগানের অভিজ্ঞতা

ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, বি.ডি.আর এবং পুলিশের বিদ্রোহ ও জনগণের গণআন্দোলনের ফলে ১৯৭১-এর মার্চে পাক সামরিক বাহিনী কিছু দিনের জন্য আত্মরক্ষামূলক অবস্থায় পতিত হয় (ঢাকা ব্যতীত)।
তারা বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে আটকে পড়ে। অচিরেই তারা প্রতিআক্রমণ চালিয়ে কান্টনমেন্টের ঘেরাও ভেঙ্গে ফেলে এবং সমগ্র পূর্ববাংলায় তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য রণনৈতিক আক্রমণ চালায়।
আওয়ামী লীগ ও তার নিয়ন্ত্রণাধীন বিভিন্ন বিদ্রোহী বাহিনী এ আক্রমণের মুখে কৌশলগত প্রতিরক্ষার লাইন না নিয়ে বাস্তব যুদ্ধে নিস্ক্রিয় আত্মরক্ষার লাইন নেয়। তারা অবস্থান নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়, শত্রুকে শহরে-বন্দরে ঠেকায়। অনভিজ্ঞ, সংখ্যা ও সরবরাহ স্বল্পতা এবং কৌশলগত নিম্নমানের জন্য তারা পরাজিত হয়, ছিন্নভিন্ন হয় এবং পলায়ন করে।
পাক বাহিনীর রণনৈতিক আক্রমণ তখন শহর সমূহ দখলের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিল। ব্যাপক গ্রামাঞ্চলে তার আক্রমণ পৌছেনি।
এ সময় পেয়ারা বাগানে আমাদের বাহিনী গঠন করা হয় এবং বাহিনীকে পুনর্গঠন, রিক্রুট, ট্রেনিং ,অস্ত্র উদ্ধার, জাতীয় শত্রু খতম, জনগণকে জাগরিত ও সংগঠিত করার কাজ চালানো হয়।
পাক সামরিক দস্যুরা গ্রাম পর্যন্ত তাদের আক্রমণ বিস্তৃত করে। কোথাও প্রতিরোধ না থাকায় ব্যাপক শক্তি সমাবেশ করে পেয়ারা বাগানের উপর প্রচণ্ড ঘেরাও দমন চালায়।
প্রচণ্ড ঘেরাও দমনের মুখে আমাদেরকে পেয়ারা বাগান থেকে সরে আসতে হয়।
জুন মাসের শেষ নাগাদ পাক সামরিক ফ্যাসিস্টদের রণনৈতিক আক্রমণ চলে। এর মাঝে বর্ষা শুরু হয়ে যাওয়ায় তারা রণনৈতিক আক্রমণ শেষ করে অর্জিত ফল ধরে রাখার জন্য রণনৈতিক সংরক্ষণের স্তরে পৌছে।
পেয়ারা বাগান থেকে প্রত্যাহার করা বাহিনীর এক অংশ গৌরনদী অঞ্চলে বর্ষাকালে বিরাটাকার গেরিলা যুদ্ধের সুচনা করে। অন্য অংশ পেয়ারা বাগানের আশেপাশেই গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যায়।
এ বর্ষাকালেই পেয়ারা বাগানের অভিজ্ঞতা প্রয়োগ করে বরিশাল, ফরিদপুর, পটুয়াখালী, পাবনা, ঢাকা, টাঙ্গাইলে আমাদের গেরিলা যুদ্ধের বিকাশ ঘটে।
১৯৭১-এর অক্টোবরে ভারত প্রত্যাগত আওয়ামী বাহিনীর উপস্থিতির ফলে আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকদের সমস্যা প্রকট হয়ে দেখা দেয়।
বিশ্বাসঘাতক আওয়ামী বাহিনী জনগণের এক অংশের সমর্থনকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। তারা আমাদের সাথে অবস্থানকারী আওয়ামী সুবিধাবাদী, ভ্রষ্টদের হাত করে আমাদের কর্মী ও গেরিলাদের অসতর্কতার সুযোগে ব্যাপক অঞ্চলে গেরিলাদের বিপদগ্রস্ত করে।
এভাবে পাক বাহিনী যে বিপর্যয় ঘটাতে পারেনি আওয়ামী বিশ্বসঘাতকদের দ্বারা তাই ঘটে। আমাদের বহু কমরেড ও গেরিলা প্রাণ হারায়, ব্যাপক অঞ্চল হাতছাড়া হয়।
পেয়ারা বাগান ও পরবর্তী সময়ের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—শত্রুর রণনৈতিক আত্মরক্ষার সময়, প্রাকৃতিক কারণে বর্ষাকালে শত্রু যে আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নেয় তখনই আমাদের রণনৈতিক আক্রমণ পরিচালনা করা উচিৎ। এ সময়ই আমাদের যুদ্ধের ও সংগঠনের বিকাশ হয়।
শত্রুর শুকনাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের রণনৈতিক আত্মরক্ষামূলক অবস্থান গ্রহণ করতে হবে, নিজেদেরকে টিকিয়ে রাখতে হবে। প্রচন্ড চাপ আসবে। আমাদের বিকাশ কম হবে। আমাদের এলাকা সংকুচিত হবে।
শত্রুর ঘেরাও দমন অভিযান ভেঙ্গে ফেলা বা তা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য একনাগাড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাজ হওয়ার প্রয়োজনঃ আক্রমণের এলাকা, আশ্রয় এলাকা প্রয়োজন, শহরে-গ্রামে ভাল কাজ প্রয়োজন।
অন্যথায় প্রচণ্ড ঘেরাও-দমন অভিযানের মুখে বিচ্ছিন্ন পকেটের পক্ষে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
শত্রুর ঘেরাও দমন স্থানীয় দালাল, খবর সরবরাহকারী না পেলে সফল করা কষ্টকর। এ কারণে জাতীয় শত্রু সরকারের চোখ ও কান উৎখাত করা দরকার।
জাতীয় শত্রু খতমের ক্ষেত্রে খুবই সতর্কতা অবলম্বন কর উচিৎ। ব্যাপক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে চরম ঘৃণ্য ও মৃত্যুদণ্ড পেতে পারে এরূপ অল্প সংখ্যক শত্রু খতম করা, তাও যথাযথ স্তর থেকে অনুমোদন করিয়ে নেওয়া। ব্যাপক জাতীয় শত্রুদের আÍসমর্পণ করানো উচিৎ।
শত্রুর ঘেরাও দমনের মুখে কতখানি টিকে থাকা সম্ভব তা বিবেচনা করে সামরিক তৎপরতা চালানো উচিৎ।
প্রতিদ্বন্দ্বীদের সমস্যা, আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতক, ভ্রষ্টদের সমস্যা সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকতে হবে এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা ও পদক্ষেপ নিয়ে রাখতে হবে।

৭।। বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ও আমাদের অভিজ্ঞতা

পূর্ববাংলার প্রাকৃতিক অবস্থার সাথে শত্রুর রণনৈতিক আক্রমণ ও রণনৈতিক সংরক্ষণ অনেকখানি জড়িত।
সাধারণতঃ শীতকালেই তারা রণনৈতিক আক্রমণ শুরু করে এবং বর্ষার প্রারম্ভেই এ আক্রমণ শেষ করে। বর্ষাকালে সৈন্য সমাবেশ, চলাফেরার অসুবিধার কারণে শত্রু পূর্ববর্তী আক্রমণের ফল ধরে রাখার জন্য রণনৈতিক সংরক্ষণের স্তরে থাকে।
এ অবস্থা অপরিবর্তনীয় নয়।
শত্রু সামগ্রিকভাবে যেহেতু রণনৈতিক আক্রমণের পর্যায়ে রয়েছে সে কারণে বর্ষাকালেও কোন এলাকায় প্রয়োজন হলে ঘেরাও দমন চালাতে পারে। গত বর্ষায় সুন্দরবনের কম্বিং অপারেশন তার প্রমাণ।
পাকবাহিনী তার রণনৈতিক আক্রমণ বর্ষার পূর্বেই শেষ করে।
ভারতীয় বাহিনী তার রণনৈতিক আক্রমণ শুকনো কালেই শুরু করে এবং বর্ষার পূর্বেই শেষ করে।
এ অবস্থা বিবেচনা করে আমরা বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের সময় আমাদের সশস্ত্র তৎপরতাকে জাতীয় শত্রু খতমের পর্যায় থেকে থানা, ফাঁড়ি দখলের পর্যায়ে উন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
এ আক্রমণের সময় পূর্ব অভিজ্ঞতা ব্যাপকভাবে কাজ লাগানো হয়। আক্রমণের এলাকা, আশ্রয় এলাকা, একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ, শহরে-গ্রামে ভাল কাজ ইত্যাদি।
শত্রুকে প্রস্তুতির সুযোগ না দিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করা, সাহসকে প্র্রাধান্য দিয়ে শত্রুর অবস্থান দখল করা, ছোট ছোট গ্রুপ ব্যবহার করা প্রভৃতির মাধ্যমে আমরা বহু থানা ও ফাঁড়ি দখল করতে সক্ষম হই।
এভাবে বহু অস্ত্র সংগৃহীত হয়, অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়, আমাদের বিরাট বিকাশ হয়।

৮।। সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ও সশস্ত্র সংগ্রাম

আমাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, যে সকল স্থানে সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ভাল ছিল সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম ভাল বিকাশ লাভ করেছে এবং এ প্রক্রিয়ায় অর্জিত ফল সমূহও ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
পক্ষান্তরে যে সকল স্থানে সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণ ভাল ছিলনা সেখানে সশস্ত্র সংগ্রাম ভাল বিকাশ লাভ করেনি বা অর্জিত ফলও ধরে রাখা যায়নি।
সুসংবদ্ধকরণের লক্ষ্য হচ্ছে কর্মী ও গেরিলাদের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, সামরিক, মতাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক মানোন্নয়ন । এ প্রক্রিয়ায় কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই করা, ভ্রষ্ট, সুবিধাবাদী, অধঃপতিত শত্রুচরদের খুঁজে বের করে অপসারিত করা, শৃংখলা ও নিরাপত্তা জোরদার করা।
১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের পূর্বে শীতকালীন সুসংবদ্ধকরণের সময় চক্রবিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় ভ্রষ্ট, খারাপ ও বাসি উপাদান অপসারিত হয়, ভাল ও তাজা উপাদান সংগৃহীত হয়, তাদের মান উন্নত হয়।
যে সকল অঞ্চলে এ সুসংবদ্ধকরণের কাজ ভাল চলে সে সকল স্থানে বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ভাল বিকাশ লাভ করে।
১৯৭৩-এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণের ফলে অর্জিত বিরাট বিকাশ ধরে রাখার জন্য শুকনোকালে মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণ পরিচালনা করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় কর্মীদের মানোন্নয়ন, কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই এবং খারাপ উপাদান অপসারণের কাজ চলছে।
এ পদক্ষেপ দ্রত যেখানে গহণ করা হয়নি সেখানেই বিপর্যয় ঘটেছে, ভ্রষ্ট বা শত্রুদের হাতে অস্ত্র চলে গেছে; পার্টি-কর্মীরা প্রাণ হারিয়েছে, এলাকায় প্রচণ্ড চাপ ও বিপর্যয় হয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, মুন্সিগঞ্জে বর্ষাকালীণ রণনৈতিক আক্রমণের সময় রিক্রুটের ক্ষেত্রে সতর্ক না হওয়ার ফলে কিছু ভ্রষ্ট ও অধঃপতিত ব্যক্তি ঢুকে পড়ে যারা পরে ডাকাতি, পত্র দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করা, শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কর্মীদের হত্যা করে অস্ত্র দখলের ষড়যন্ত্র চালায়।
পার্টি এদের তৎপরতাকে ধ্বংস করে দেয়।
কুমিল্লার মতলব এলাকার কর্মীদের কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই না করার ফলে ভ্রষ্ট, ডাকাতরা পার্টিতে অনুপ্রবেশ করে। তারা অস্ত্র আত্মসাৎ করার জন্য কয়েকজন কর্মী ও গেরিলাদের হত্যা করে।
ফরিদপুরের ভ্রষ্টরা অস্ত্র আত্মসাৎ করে। গোপনীয়তা-নিরাপত্তা বজায় না থাকার ফলে অস্ত্র খোয়া যায়, কাজে বিপর্যয় আসে।
বর্তমানে মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণের যে কাজ চলছে তা ভালভাবে সম্পন্ন করতে হবে; বাসী, খারাপ এবং শত্রুচরদের অপসারিত করতে হবে, আসন্ন বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ ভালভাবে পরিচালনা করার জন্য।

৯।। সাংগঠনিক কাজ ও সশস্ত্র সংগ্রামের সম্পর্ক এবং অসম বিকাশ

আমাদের সশস্ত্র সংগ্রাম গড়ে তোলা ও বিকাশ সাধনের প্রাথমিক শর্ত হচ্ছে ভাল সাংগঠনিক কাজ।
সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে গেরিলা রিক্রুট হয়। শেল্টার গড়ে উঠে, লক্ষ্যবস্তুর অনুসন্ধান পাওয়া যায়। আক্রমণের পূর্বে সমাবেশ এবং পরে সরে পড়া সম্ভব হয়।
সুশৃংখল, গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা বজায় আছে এরূপ সাংগঠনিক কাজ শূণ্য থেকে গেরিলা গড়ে তোলার জন্য অপরিহার্য।
পার্টি-কাজের মাধ্যমে গেরিলা রিক্রুট করা, তাদের কেডার ইতিহাস যাচাই, এককভুক্ত করা, শৃঙ্খলা, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা এবং পার্টি লাইনে শিক্ষিত করা, সশস্ত্র প্রচার ও জাতীয় শত্রু খতমের মাধ্যমে ট্রেইন করা, এভাবে উচ্চতর সামরিক তৎপরতার জন্য প্রস্তুত করা ইত্যাদি কাজ সাংগঠনিক কাজের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সাংগঠনিক ক্ষেত্রে সকল অঞ্চলে, অঞ্চলের মধ্যে সকল উপ-অঞ্চলে আবার উপ-অঞ্চলের মধ্যে সকল এলাকায় ভাল কাজ থাকে না।
কাজের বিকাশ ও সুসংবদ্ধতার বিচারে অঞ্চলগুলোকে উন্নত, মাঝারী ও পশ্চাদপদতে ভাগ করা যায়।
উপ-অঞ্চল, এলাকার ক্ষেত্রে ও ইহা প্রযোজ্য।
একইভাবে সামরিক তৎপরতার দিক দিয়ে অগ্রসর, মাঝারি, পশ্চাদপদ এই তিনভাগে অঞ্চল, উপ-অঞ্চল এবং এলাকাসমূহকে ভাগ করা যায়।
সাংগঠনিক কাজের ক্ষেত্রে অগ্রসর অঞ্চল, উপ-অঞ্চল এবং এলাকগুলোকে আকঁড়ে ধরতে হবে। উন্নত অঞ্চল থেকে কর্মী বের করে মাঝারি, অনুন্নত স্থানে প্রেরণ; অনুন্নত, মাঝারি স্থান থেকে কর্মী এনে ট্রেইন করা, আশ্রয়স্থান ইত্যাদির কাজে ব্যবহার করতে হবে।
সামরিক তৎপরতা পরিচালনার সময় সামগ্রিক কাজের ক্ষেত্রে উক্ত স্থানের ভূমিকা, উক্তস্থানে সম্ভাব্য শত্রু চাপের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত অবস্থা ইত্যাদি বিবেচনা করতে হবে।
উদাহরণস্বরূপ একটি স্থান, সমগ্র অঞ্চল, উপ-অঞ্চল বা এলাকার কাজের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। স্বভাবতঃই সেখানে প্রচণ্ড সামরিক তৎপরতা চালালে শত্রুচাপে সেখান থেকে উৎখাত হতে হবে। ফলে সামগ্রিক কাজের ক্ষতি হবে।
কোন এলাকায় ভাল সাংগঠনিক ও সশস্ত্র তৎপরতা শত্রুর প্রবল চাপে বা আভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতী কাজে হ্রাস পেতে পারে বা তৎপরতা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
পূর্ববাংলা ক্ষুদ্রদেশ, শত্রু দ্রুত সমাবেশিত হতে পারে। সমতল ভূমি এবং শত্রুর পক্ষে বৈদেশিক সহায়তা লাভ সম্ভব ইত্যাদি কারণ থেকে দেখা যায়—বিচ্ছিন্ন পকেট হিসেবে সশস্ত্র তৎপরতা পরিচালনা করলে তাকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
পূর্ববাংলার এক/একাধিক জেলায়ও ভাল সশস্ত্র তৎপরতা চালালে তাও টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবেনা।
পূর্ববাংলার সকল জেলায় গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে। যোগাযোগ পথে শত্রুদের হয়রানি করতে হবে। সমভূমিতে, পাহাড়ে গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে, শহরে গ্রামে শত্রুকে ব্যস্ত রাখতে হবে।
এভাবে শত্রু সর্বত্রই আক্রান্ত হয়ে তার সৈন্যবাহিনীকে বিভক্ত করতে, পাহরামূলক তৎপরতায় নিয়োজিত করতে বাধ্য হবে। বিভিন্ন এলাকায় ঘেরাও দমনের জন্য তার সচল বাহিনীর স্বল্পতা দেখা দেবে।
এভাবে আভ্যন্তরীণ বহু গ্রামাঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবে।

১০।। গেরিলা বাহিনী বিকাশের প্রথম পর্যায় এবং উদ্যোগ-নমনীয়তা-পরিকল্পনা

আমাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায় হচ্ছে—গেরিলা বাহিনী শূণ্য থেকে গড়ে উঠছে। তারা অনিয়মিত, তাদের রয়েছে অভিজ্ঞতার অভাব, সংখ্যাল্পতা, অস্ত্র স্বল্পতা। এ সকল কারণে চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে খতম করতে তারা সক্ষম নয়।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায় হচ্ছে—গেরিলা বাহিনীর অভিজ্ঞতা, সংখ্যা প্রাচুর্যতা, অস্ত্র প্রাচুর্যতা এবং নিয়মিত চরিত্রের হয়েছে। চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে তারা খতম করতে সক্ষম।
কোথাও কোথাও আমাদের গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায় চলছে। আবার কোথাও কোথাও আমরা বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রবেশ করছি।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের প্রথম পর্যায়ে আমরা উদ্যোগ অর্থাৎ কার্যকলাপের স্বাধীনতা বজায় রাখছি গোপন কর্মপদ্ধতি ও সরে পড়ার মাধ্যমে।
একটি অপারেশন শেষে শত্রুর ঘেরাও দমন থেকে বাঁচার জন্য গেরিলারা নিজ নিজ শেল্টারে চলে যায় (গোপন কর্মপদ্ধতির কারণে সে অপ্রকাশিত), প্রকাশিত গেরিলারা ঘেরাও দমন হবে না এরূপ এলাকায় আশ্রয় নেয়।
অপ্রকাশিত গেরিলাদের পক্ষে ঘেরাও দমনের মুখে টিকে থাকা অসুবিধাজনক হলে তারাও নিরাপদ স্থানে সরে পড়ে।
এভাবে বর্তমানে উদ্যোগ বজায় রাখার মুখ্য পদ্ধতি হচ্ছে সরে পড়া।
এ কারণে আমাদের কাজ হওয়া প্রয়োজন একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে, গোপনীয়তা, নিরাপত্তা, শৃংঙ্খলা হওয়া উচিত কঠোর। শহরে, গ্রামে ভাল কাজ হওয়া উচিত।
এছাড়া আশ্রয় এলাকা, আক্রমণ এলাকা ভাগ করে সামরিক কাজ করা উচিত যাতে শত্রু বুঝতেই না পারে কোথায় আমাদের অবস্থান।
এ পদ্ধতিতে উদ্যোগ বজায় রাখা প্রয়োজন; গেরিলারা যখন নতুন, অনভিজ্ঞ, সংখ্যায় কম, অস্ত্র কম এবং শত্রুর ঘেরাও দমনকারী ইউনিটকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করতে তারা অক্ষম।
উদ্যোগের মূর্ত প্রকাশ হচ্ছে নমনীয়তা।
নমনীয়তা প্রকাশ পায় গেরিলাদের একত্রিত করা, ছড়িয়ে দেওয়া ও স্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে।
গোপন কর্মপদ্ধতির কারণে কোন অপারেশন পরিচালনার জন্য গেরিলারা গোপন শেল্টারে গোপনে একত্রিত হতে সক্ষম হয়।
একইভাবে আক্রমণ শেষে গেরিলারা সরে পড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে।
প্রচণ্ড চাপের মুখে গেরিলারা প্রয়োজনীয় স্থান পরিবর্তন করে অর্থাৎ অন্য এলাকায় আশ্রয় নেয় বা কাজ করে। পরে চাপ কমে গেলে তারা ফিরে আসে।
অন্য অঞ্চলে অভিজ্ঞ গেরিলা পাঠিয়ে গেরিলাযুদ্ধ শুরু করার জন্য গেরিলাদের ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
গেরিলাদের ছড়িয়ে থাকার কারণ হচ্ছে শেল্টার, খাদ্য, অর্থ, অস্ত্রের স্বল্পতা, অনিয়মিত চরিত্র, শত্রুর খবর সংগ্রহের চ্যানেলের গ্রামে উপস্থিতি এবং শত্রুর ঘেরাও ভেঙ্গে ফেলার অক্ষমতা ইত্যাদি।
ব্যাপক চাপের মুখে স্থান পরিবর্তনের পূর্বে অস্ত্রশস্ত্র নিরাপদে রাখা, স্থানীয় কাজের সাথে সংযোগ রাখার ব্যবস্থা রাখা, নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে অস্ত্র আত্মসাৎ বা অপব্যবহার, খোয়া যাওয়ার সমস্যা যাতে উদ্ভব না হয় তার ব্যবস্থা রাখা।
প্রাথমিক বা অন্য যে কোন স্তরে পরিকল্পনা ব্যতীত গেরিলাযুদ্ধ পরিচালনা, তা টিকিয়ে রাখা ও বিকাশ ঘটানো সম্ভব নয়।
ঘেরাও দমন ও আভ্যন্তরীণ শত্রুদের অন্তর্ঘাতী কাজ থেকে টিকে থাকা, অস্ত্র গেরিলা সংগ্রহ, ট্রেনিং-মানোন্নয়ন; অর্থ, খাদ্য, শেল্টারের ব্যবস্থা, গেরিলাদের নিয়মিতকরণ; বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ ইত্যাদি সমস্যার ভিত্তিতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করে অগ্রসর হতে হবে।
বিস্তীর্ণ অঞ্চলে কাজ গড়ে তুলতে হবে যাতে বিকল্প আশ্রয়স্থল গড়ে উঠে। অস্ত্র সংগ্রহের জন্য শত্রুর দুর্বল অবস্থান আক্রমণ করে দখল করা বা দুর্বল চলমান শত্রুকে ঘিরে ফেলে খতম করা, জাতীয় শত্রু খতম ও আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে শত্রুর খবর সংগ্রহের ব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলা, সশস্ত্র প্রচার টিমের মাধ্যমে ব্যাপক জনমত গড়া, এ প্রক্রিয়ায় গেরিলাদের ট্রেইন করা। গ্রাম ভিত্তিক চাঁদা সংগ্রহ, শেল্টারের ব্যবস্থা করা, নিয়মিত গেরিলা গড়ে তোলা ইত্যাদি কাজ হচ্ছে গেরিলাবাহিনী বিকাশের প্রথম পর্যায়ের লক্ষ্য।

১১।। গেরিলা বাহিনী বিকাশের দ্বিতীয় পর্যায় এবং উদ্যোগ-নমনীয়তা-পরিকল্পনা

সরে পড়ার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখার পদ্ধতি চিরদিন অনুসরণ করলে শত্রুর ঘেরাও দমন কখনই ভেঙ্গে ফেলা সম্ভব হবে না। জনগণের আস্থা নষ্ট হবে, সচল বাহিনী ও ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবেনা, শেষ পর্যন্ত আমরা ধ্বংস হবো।
সরে পড়ার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখাকে আক্রমণের মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখায় রূপান্তরিত করতে হবে।
এটা কিভাবে সম্ভব?
শত্রুর ঘেরাও দমনকানকারী ইউনিটের পুরোটাই (ছোট ও দুর্বল হলে) বা তার অংশকে অতর্কিতে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করা। এভাবে শত্রুকে এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য করা, তার ঘেরাও দমন অভিযান ভেঙ্গে ফেলার মাধ্যমে উদ্যোগ বজায় রাখতে হবে। অর্থাৎ চলমান শত্রুকে অতর্কিতে ঘিরে ফেলে খতম করা।
এটা এ্যামবুশ যুদ্ধ বলেও পরিচিত।
এভাবে পাঁচ বা দশ জনের একটি ইউনিট ধ্বংস হয়ে গেলে শত্রু আরো বড় ইউনিট পাঠাবে। শত্রুর পক্ষে সমগ্র পূর্ববাংলার গ্রামাঞ্চলে বড় বড় ইউনিট পাঠিয়ে ঘেরাও দমন চালানো সম্ভব নয়। তার সংখ্যাস্বল্পতা দেখা দেবে।
ফলে বহু গ্রাম যেখানে শত্রু যেতে পারেনা তা আমাদের ঘাঁটি এলাকায় রূপান্তরিত হবে।
চলমান শত্রু ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতম করার জন্য প্রয়োজন হবে দ্রুত একত্রিত হওয়া, ছড়িয়ে পড়া ও স্থান পরিবর্তনের।
এটা সম্ভব হবে নিয়মিত বাহিনীর পক্ষে যারা কাছাকাছি অবস্থান করে দ্রুত একত্রিত হতে পারে।
শত্রুর ঘেরাও দমন অভিযান আর আমাদের পাল্টা ঘেরাও দমন অভিযান চালিয়ে শত্রুর দুর্বল ইউনিটকে খতম করা, এ ‘করাত প্যাটার্নের’ যুদ্ধ গেরিলা যুদ্ধের রণনৈতিক আত্মরক্ষার সুদীর্ঘকাল পর্যন্ত চলবে।
কাজেই আমাদের গেরিলাদের এ যুদ্ধে অতিমাত্রায় পারদশির্তা অর্জন করতে হবে, আর এটাই হবে আমাদের আক্রমণের প্রধান রূপ।
শত্রুর দুর্বল ইউনিট ঘিরে ফেলে খতম করা বা গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র লাভের জন্য এসময় আমাদেরকে তরঙ্গমালার মত আক্রমণ করতে হবে এবং কিছু ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হবে।
এ কারণে ব্যাপক হারে গেরিলা সংগ্রহ করতে হবে যাতে ক্ষয়ক্ষতি হলেও আমাদের যুদ্ধের প্রয়াসে কোন বিঘ্ন না হয়।
তবে ক্ষয়ক্ষতি অবশ্যই সর্বনিম্ন করতে হবে।
এ স্তরেও শত্রুর দুর্বল অবস্থান অতর্কিতে আক্রমণ করে দখল করা, এভাবে অস্ত্র সংগ্রহ করার পদ্ধতি চালিয়ে যেতে হবে।
এ স্তরে শত্রুর ঘেরাও দমন ভাঙ্গা সম্ভব না হলে নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
এ অবস্থায় উদ্যোগ পুনরায় অর্জনের জন্য সরে পড়তে হবে।
সরে পড়ার সময় একসাথে বা বিভক্ত হয়ে বা শত্রুকে ঠেকানোর জন্য ছোট গ্রুপ রেখে সরে পড়তে হবে।
সরে পড়ার প্রাক্কালে পুনরায় একত্রিত হওয়া, বিভিন্ন ইউনিটের কাজ ঠিক করে দিতে হবে।
এছাড়া জনগণের মাঝে প্রচার ও তাদেরকে সংগঠিত করা, রসদপত্রের স্বল্পতা, বিস্তীর্ণ অঞ্চলে গেরিলাযুদ্ধের বিস্তৃতির জন্য গেরিলা বাহিনীকে অংশে বিভক্ত করে ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন হয়।
তবে শত্রুর ঘেরাও দমন ভেঙ্গে ফেলার জন্য একত্রীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন যাতে আমাদের ব্যাপক শক্তি শত্রুর একটি দুর্বল ইউনিট ধ্বংসের জন্য প্রয়োগ করা যায়। অর্থাৎ প্রতিটি লড়াইয়ে আমরা যেন চূড়ান্ত উৎকৃষ্টতা অর্জন করতে পারি।
সচল গেরিলাবাহিনীকে একটি শত্রু ইউনিট ধ্বংস করে দ্রুত অপর একটি ইউনিট ধ্বংস করা এভাবে একনাগাড়ে শত্রর বহু ইউনিট ধ্বংসের দিকে ট্রেইন করতে হবে।
শত্রুর চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতমের ক্ষেত্রে যথাসম্বব পরিকল্পনা মাফিক কাজ করার ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থাৎ শত্রুর দুর্বল ইউনিটকে খুঁজে বের করা ও তাকে নির্মূল করার জন্য ভৌগলিকভাবে ও জনসমর্থনের দিক দিয়ে সুবিধাজনক স্থানে নিয়ে এসে তাকে খতম করতে হবে।। অর্থাৎ তাকে ফাঁদে ফেলতে হবে।
প্রতিটি লড়াই আমরাই নির্ধরণ করতে সক্ষম হই। এভাবে যুদ্ধ চালাবার চেষ্টা করতে হবে।
শত্রুর দুর্বল ইউনিট খুঁজে বের করা, তাকে ফাঁদে ফেলার জন্য বিস্তৃত অঞ্চল প্রয়োজন যাতে গেরিলারা শত্রু সম্পর্কে তথ্য লাভের এবং তাকে প্রলুব্ধ করে নির্দিষ্ট স্থানে আনতে সক্ষম হয়।
এ স্তরে গেরিলা পরিচালকের পরিকল্পনা মাফিক গেরিলা তৎপরতা ছড়িয়ে দিয়ে অঞ্চলের বিস্তৃতি বাড়ানো, ফাঁকসমূহ পূরণ, অস্ত্র-খাদ্য-অর্থ ও অন্যান্য সরবরাহ সংগ্রহ, প্রাথমিক খবর প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে তোলা, স্থানীয় গেরিলা বাহিনী গঠন, নিয়মিত বাহিনী বৃদ্ধি, জনগণকে সংগঠিত ও তাদেরকে গণসংগ্রামে পরিচালনা এবং সশস্ত্র তৎপরতায় অংশগ্রহণ করানো ইত্যাদি কাজ করতে হবে।
এগুলো পরিকল্পনার আওতায় পড়ে।

১২।। গেরিলা সংগ্রহ ও নিয়মিত বাহিনী গঠন

প্রাথমিক পর্যায়ে সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে সংগৃহীত কর্মীদের মধ্য থেকেই গেরিলা রিক্রুট হয়।
কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাইয়ের মাধ্যমে শত্রুর চর, ভ্রষ্ট ও শত্রু শ্রেণীর লোকদের গেরিলা হিসেবে অনুপ্রবেশ ঠেকানো হয়।
গেরিলাদের প্রথমে সশস্ত্র প্রচার টিম ও জাতীয় শত্রু খতম অপারেশনে পাঠানো হয়।
সশস্ত্র প্রচার টিমের তৎপরতার মাধ্যমে রাত্রিকালীন চলাচল, অস্ত্র সংক্রান্ত ট্রেনিং, অনুসন্ধান, প্রচার, জননগণকে জাগরিত করা ইত্যাদি কাজে গেরিলাদের অভিজ্ঞ ও যাচাই করা হয়।
জাতীয় শত্রু খতম হচ্ছে ছোট আকারের গেরিলা অপারেশন। এর মাধ্যমে অনুসন্ধান, পরিকল্পনা, সমাবেশ, বাস্তব হামলা, সরে আসা, জটিল পরিস্থিতির মোকাবেলায় গেরিলাদের অভিজ্ঞ ও যাচাই করা হয়।
গেরিলাদের মান উন্নত ও মতাদর্শগত পুনর্গঠন করার জন্য ক্লাশ নেওয়া হয়।
এভাবে একটি জেলার বিভিন্ন মহকুমা, মহকুমাস্থ থানা এবং থানার আওতাধীন ইউনিয়ন ও গ্রামে সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে সামরিক লোকদের রিক্রুট করা হয়।
প্রাথমিক পর্যায়ে অনভিজ্ঞদের অভিজ্ঞ গেরিলাদের সাথে অপারেশনে দিয়ে বা অভিজ্ঞ গেরিলা পরিচালকদের সাথে দিয়ে অভিজ্ঞ করা হয়।
বর্তমানে গেরিলা যুদ্ধকে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত করার জন্য গেরিলাদের সেকসন, প্লাটুন ও কোম্পানীভুক্ত করা। এ সকল ইউনিট সচল হলে ব্যাটেলিয়ন ও ব্রিগেড গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
গেরিলারা প্রথমে অসার্বক্ষনিক হিসেবে কাজ করে, গেরিলা তৎপরতা ও স্থানীয় সাংগঠনিক কাজের বিকাশের প্রক্রিয়ায় তারা সার্বক্ষণিক হয়।
বর্তমানে কৃষকদের মাঝে কাজ ছড়িয়ে পড়ায় বহু কৃষক গেরিলা হিসেবে রিক্রুট হচ্ছে। নিয়মিতকরণ ও ভরণপোষণের সমস্যার সমাধান হলে গেরিলাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যই হবে কৃষক।
পেয়ারা বাগানে ও অন্যান্য ফ্রন্ট এলাকায় আমাদের যে নিয়মিত বাহিনী গঠন করা হয়েছিল তাদের সদস্যদের অনেকেই ছিল কৃষক।
১৯৭৩ এর বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণে সচল বাহিনী গড়ে উঠে। অন্যান্য অঞ্চলে গেরিলা তৎপরতা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এ বাহিনীকে বিভিন্ন স্থানে সাংগঠনিক কাজের সাথে যুক্ত করে পাঠান হয়।
সচল বাহিনী গঠনের সমস্যা হচ্ছে গেরিলা সংগ্রহ, অস্ত্র, অর্থ, খাদ্য ও শেল্টারের সমস্যা।
বর্তমানে পূর্ববাংলায় প্রচুর গেরিলা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে; শত্রুর দুর্বল অবস্থান দখল বা দুর্বল চলমান ইউনিট ঘিরে ফেলে অস্ত্র সংগ্রহ করা, জাতীয় শত্রু উৎখাত এবং প্রামভিত্তিক চাঁদা তোলা জনমত বিপ্লবের পক্ষে সংগঠিত করার মাধ্যমে অর্থ-খাদ্য ও শেল্টার সমস্যা সমাধান করা সম্ভব।
এভাবে সকল সমস্যা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
সচল বাহিনীকে শত্রুর দুর্বল চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে খতম করার জন্য দ্রুত একত্রীকরণ প্রয়োজন।
একারণে তাদের ক্যাম্পিং করে অবস্থান করতে হবে। কাছাকাছি কয়েকটি বাড়ীতে তারা অবস্থান করতে পারে।
পেয়ারা বাগান ও অন্যান্য ফ্রন্টে এবং গত বর্ষায় সচলবাহিনী জনগণের বাড়ীতে ক্যাম্পিং করে অবস্থান করতো।
সচল বাহিনীর টিকে থাকা ও বিকাশের জন্য স্থানীয় সাংগঠনিক কাজ ভাল হতে হবে। শেল্টার, শত্রুর গতিবিধি, জনগণের সহযোগিতা লাভ, শত্রুদের উৎখাত করা ইত্যাদি কাজ স্থানীয় সংগঠনের সাহায্য ব্যতীত সম্ভব নয়।
সচল এবং নিয়মিত বাহিনী টিকে থাকা ও বিকাশ লাভের জন্য গ্রামের অসার্বক্ষনিক গেরিলাদের নিয়ে স্থানীয় গ্রাম্য আত্মরক্ষাবাহিনী, একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে তৎপরতা চালানোর জন্য নিয়মিত আঞ্চলিক বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।
আত্মরক্ষা বাহিনী আঞ্চলিক নিয়মিত বাহিনীতে থাকাকালীন ট্রেনিং, যাচাই ও মানোন্নয়নের মাধ্যমে ভাল উপাদান বেরিয়ে আসবে।
এদেরকে নিয়মিত কেন্দ্রীয় বাহিনীতে নিতে হবে।
এভাবে নিয়মিত কেন্দ্রীয় বাহিনী অভিজ্ঞ ও ভাল গেরিলাদের দ্বারা গঠন করা সম্ভব হবে।
গ্রাম্য আত্মরক্ষা বাহিনী ও আঞ্চলিক বাহিনী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী হচ্ছে ডান হাত বাম হাতের মত। একটাকে বাদ দিয়ে অপরটা চলতে পারেনা।
সচল বাহিনীতে রাজনৈতিক বিভাগ প্রতিষ্ঠা, কোম্পানীতে পার্টি-শাখা গঠন, বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক কমিশার নিয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিকভাবে ট্রেইন করা ও রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা কায়েম করতে হবে।
গেরিলাবাহিনীর নিয়মিতকরণের সাথে কমান্ডার, কেডাদের ও সৈনিকদের রাজনৈতিক ও সামরিক ট্রেনিং প্রদানের জন্য বিভিন্ন স্তরের স্কুলের ব্যবস্থা করতে হবে।
কখনও কখনও বড় শত্রুকে ধ্বংস করা বা বড় ঘেরাও দমন ভেঙ্গে ফেলা অথবা প্রচণ্ড চাপের মুখে সরে পড়ার জন্য আন্তঃঅঞ্চল, আন্তঃউপঅঞ্চল সমন্বয় প্রয়োজন।
এ সমন্বয়ের ফলে একাধিক অঞ্চল বা উপ-অঞ্চলের গেরিলাদের সমাবেশ করা যাবে বা এক অঞ্চল, উপ-অঞ্চলের গেরিলারা অন্য অঞ্চল, উপ-অঞ্চলে সরে পড়তে পারবে।
এ কারণে বিভিন্ন অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলের মধ্যকার ফাঁকসমূহ দূর করতে হবে এবং বিভিন্ন অঞ্চল ও উপ-অঞ্চলের মধ্যে ভাল সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

১৩।। ঘাঁটি এলাকার সমস্যা

একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন, তা টিকিয়ে রাখা ও শক্তিশালী করা এবং শেষ পর্যন্ত এর সহায়তায় শত্রুদের পরাজিত করার জন্য ঘাঁটি এলাকা অপরিহার্য। ঘাঁটি এলাকা হচ্ছে রণনৈতিক এলাকা যার উপর নির্ভর করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা বিবেচনা করে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যার সমাধান করতে হবে।
খুলনার দক্ষিণাংশ, পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সিলেটের কিয়দংশ ব্যতীত সমগ্র পূর্ববাংলাই সমভূমি, নদীমাতৃক; পর্বত ও গভীর অরণ্য বর্জিত। কাজেই এখানে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যা হচ্ছে সমভূমিতে ঘাঁটি এলাকা গঠনের সমস্যা।
জঙ্গলাকীর্ণ ও পার্বত্য অঞ্চলে ঘাঁটি এলাকা গড়ে তোলার দিকে আমরা প্রথম থেকেই গুরুত্ব প্রদান করেছি। এ সকল স্থানের দুর্গমতা এবং সরকারের সাথে সংযোগ কম থাকার কারণে এগুলো স্বাভাবিক ঘাঁটি হিসেবে বিরাজ করছে।
পার্বত্য চট্রগ্রাম ও সিলেটের পার্বত্য অঞ্চলের অভ্যন্তরে জনগণকে সংগঠিত করে ঘাঁটি এলাকা গড়ার প্রচেষ্টা চলছে।
পার্বত্য এলাকায় ঘাঁটি গঠনের অন্যতম সমস্যা হচ্ছে নিকটবর্তী বাঙালী এলাকায় কাজ হওয়া যাতে পার্বত্য চট্রগ্রামের কাজকে শত্রু বিচ্ছিন্ন করে নির্মূল করতে না পারে।
এ দিকে গুরুত্ব আরোপ করা হচ্ছে।
জঙ্গলাকীর্ণ দক্ষিণাঞ্চলে কাজের বিস্তৃতি ঘটানো উচিত।
ঘাঁটি এলাকা গঠনের দিক দিয়ে উপরোক্ত স্থানগুলো খুবই সুবিধাজনক।
নদী মোহনা ও চরাঞ্চলও ঘাঁটি গঠনের দিক দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর গুরুত্ব সম্পন্ন। স্থানীয় ডাকাত ও শত্রুদের উৎখাত করে ঘাঁটি এলাকা গঠন ও নৌ গেরিলা গড়ে তোলা উচিত।
ঘাঁটি এলাকার মৌলিক সমস্যা হচ্ছে একটি শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী গঠন, শত্রুর পরাজয় এবং জনগণকে সংগঠিত করা।
আমাদের ঘাঁটি এলাকা গেরিলা তৎপরতার প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠে।
প্রথমে গেরিলা অঞ্চল অর্থাৎ শত্রুর নিয়ন্ত্রণ আছে আবার আমাদের তৎপরতাও রয়েছে এরূপ অঞ্চল হিসেবে বিরাজ করে।
জনগণ ঘৃণীত চরম অত্যাচারী সরকারী চরদের খতম করা এবং অন্যান্যদের আত্মসমর্পণ করানোর মাধ্যমে গ্রামের জনগণকে প্রতিক্রিয়াশীলদের কব্জা থেকে মুক্ত করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনগণকে জাগরিত করা, গেরিলা সংগ্রহ করা, অস্ত্র সংগ্রহ করা হয়।
শত্রু ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে এলাকায় প্রবেশে ভয় পায়।
বর্তমানে ব্যাপক গেরিলা অঞ্চল গড়ে তোলা, তাকে বিস্তৃত করা, সশস্ত্র বাহিনী গঠনের বিরাট তৎপরতা চলছে।
শত্রুর দুর্বল অবস্থান দখল, চলমান শত্রুকে ঘেরাও করে খতম করার তৎপরতা ব্যাপকভাবে অচিরেই শুরু হবে।
শত্রুর চলমান ইউনিটকে ঘিরে ফেলে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া ব্যাপকভাবে চালু করা এবং আমাদের ইউনিটসমূহকে এ বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে হবে।
এর সাথে যুক্ত করতে হবে অতর্কিতে দুর্বল শত্রু-অবস্থান দখল করা, গুরুত্বপূর্ণ শত্রু অবস্থান দখলের জন্য তরঙ্গমালার মত আক্রমণের পদ্ধতি।
ঘাঁটি এলাকা গঠনের জন্য সকল জেলায়, শহরে, গ্রামে, যোগাযোগ পথে, পাহাড়ে-সমভূমিতে গেরিলা তৎপরতা চালাতে হবে, শত্রু সৈন্যকে বিভক্ত করে ফেলতে হবে।
এভাবে শত্রু বিস্তীর্ণ গ্রামাঞ্চলে ঘেরাও দমন চালাতে অক্ষম হয়ে পড়বে এবং আমাদের ঘাঁটি এলাকা গড়ে উঠবে।
শত্রুর শক্তিশালী অবস্থানের নিকটস্থ (বড় শহর, যাতায়াত পথ, শিল্পনগর) অঞ্চলগুলো সুদীর্ঘদিন ধরে গেরিলা অঞ্চল হিসেবে বিরাজ করবে। এ সকল এলাকার শত্রুদেরকে আমাদের নিকট আত্মসমর্পণ করতে, আমাদের সাথে সহযোগিতা করতে বাধ্য করতে হবে।

১৪।। বিপ্লবী যুদ্ধ ও গণসংগ্রাম

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা বাঙালী দ্বারা বাঙালী দমনের নীতি গ্রহণ করেছে; রক্ষী, সেনাবাহিনী, বিডিআর, পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী সংগঠিত করেছে।
বাঙালীদের দ্বারা গঠিত পূর্ববাংলার এ সকল বাহিনীকে যুদ্ধ থেকে বিরত করা, তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়া, তাদের নিষ্ক্রিয় করা বা দলে টেনে আনার জন্য গণসংগ্রাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
উপরন্তু গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় ব্যাপক জনগণকে জাগরিত করা, শত্রুর বিরুদ্ধে পরিচালিত করা সম্ভব।
পূর্ববাংলার বিশেষত্ব-ক্ষুদ্র দেশ, ঘনবসতি, অর্থনৈতিকভাবে সমবিকশিত, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অভিন্নতার কারণে গণসংগ্রাম অভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৯৫২ সালের গণসংগ্রাম, ১৯৬৯ সালের গণসংগ্রাম, ১৯৭১ সালের গণসংগ্রাম এর প্রমাণ।
কাজেই উচ্চ পর্যায়ের গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় অভ্যুত্থান সংগঠিত করা। এভাবে শত্রুর এলাকা খর্ব করা, আমাদের এলাকা বাড়ানো, সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা সম্ভব।
গণসংগ্রামের জন্য গ্রামের কৃষক, যুবক, নারী, বুদ্ধিজীবীদের মাঝে কাজ প্রয়োজন, বিশেষভাবে নারীদের মাঝে ভাল কাজ প্রয়োজন।
সশস্ত্র সংগ্রামের বিকাশের প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ যুবকই এ কাজে ব্যাস্ত থাকবে। কাজেই গ্রাম্য নারীরাই গ্রামে থাকবে গণসংগ্রাম পরিচালনার জন্য।
উপরন্তু নারীদের মিছিল, মিটিং, ঘেরাও অবস্থানের উপর শত্রুর দমনমূলক তৎপরতা সমগ্র এলাকার জনগণকে বিপ্লবের পক্ষে নিয়ে আসবে, শত্রুর বিরুদ্ধে ঘৃণা তীব্রতর করবে।
এছাড়া নারীদের সংগ্রাম ভাড়াটে বাহিনী এবং জনগণের মাঝে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করবে।
উপরন্তু নারীরা সমাজের সবচাইতে পশ্চাদগামী অংশ। গণসংগ্রামের প্রক্রিয়ায় তাদেরকে জাগরিত করা গেলে বিপ্লবের বিজয় নিশ্চিত হবে।
শহরে গরীব জনসাধারণ, শ্রমিক, ছাত্র-বুদ্ধিজীবী, নারী এবং বিভিন্ন পেশাধারীদের মাঝে কাজ করতে হবে। তাদের দ্বারা পরিচালিত স্বতঃস্ফূর্ত গণসংগ্রামকে দেশব্যাপী সমন্বিত গণসংগ্রামে রূপ দিতে হবে।
বিভিন্ন দাবীদাওয়া, অত্যাচার, নির্যাতনের প্রতিবাদে গণসংগ্রাম পরিচালনা করতে হবে।
এ গণসংগ্রাম আমাদের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে তা গোপন থাকবে। গণসংগ্রামকারীরা হচ্ছে আইন অনুগত সাধারণ নাগরিক।

১৫।। পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা ও আত্মনির্ভরশীলতা

পূর্ববাংলা ভৌগলিকভাবে ভারত পরিবেষ্টিত, বঙ্গোপসাগরও ভারত নিয়ন্ত্রিত। বার্মার সাথে সীমান্ত রয়েছে, তাও ‘বাংলাদেশ’ সরকার কর্তৃক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ হচ্ছে পূর্ববাংলার বিপ্লবের অন্যতম শত্রু। উপরন্তু সেখানে বিপ্লবী তৎপরতা শক্তিশালী নয়। কাজেই পূর্ববাংলায় ভারত বিরোধী তৎপরতায় কোন সহায়তা লাভ করার সম্ভাবনা কম (জনগণের সমর্থন ব্যতীত)।
বার্মার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
উপরন্তু পূর্ববাংলার সাথে সাধারণ সীমান্ত রয়েছে এবং আমাদেরকে সহায়তা (ট্রেনিং, অস্ত্র ইত্যাদি দিয়ে) করতে পারে এরূপ কোন দেশের অস্তিত্ব নেই।
কাজেই পূর্ববাংলার বিপ্লবকে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগনের উপর নির্ভর করে বিজয় অর্জন করতে হবে।
অস্ত্র-ট্রেনিংসহ সকল বিষয়েই আত্মনির্ভরশীল হতে হবে, জনগণের উপর নির্ভর করতে হবে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণী ব্যতীত বুর্জোয়া বা অন্য কোন শ্রেণীর পক্ষে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগণের উপর নির্ভর করে বিপ্লবী যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
১৯৭১-এ বুর্জোয়ারা ভারতে আশ্রয় নেয় এবং ভারতীয় পুতুলে পরিণত হয়, দেশকে বিক্রি করে।
অতীতে সুভাষ বোসও পরনির্ভরশীলতার পথ অনুসরণ করে, জাপানের পুতুলে পরিনত হয়।
পূর্ববাংলার সীমান্তে এমন কোন দেশ নেই যেখানে বুর্জোয়ারা আশ্রয় নিতে পারে বা সেখানে থেকে ভারত বিরোধী সংগ্রাম চালাতে পারে বা সাহায্য পেতে পারে।
এ কারণে পূর্ববাংলায় বুর্জোয়াদের ভবিষ্যত অন্ধকার।
পূর্ববাংলার সর্বহারাদের পূর্ববাংলার বাস্তব অবস্থার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আত্মনির্ভরশীলতা ও জনগণের উপর নির্ভর করার লাইন গ্রহণ করতে হবে।
চীন বা অন্য কোন ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের অস্ত্র ছাড়া বা সমর্থন ছাড়া বিপ্লব করা যাবে না এ ধরণের পরনির্ভরশীলতার মানসিকতা দূর করতে হবে।
সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহ সহ বিশ্বের সকল দেশ, জনগণ ও জাতির সমর্থন আমরা কামনা করি, আমরা তাদের সংগ্রামকে সমর্থন করি।
কিন্তু বিপ্লব করার জন্য আমাদেরকে নির্ভর করতে হবে নিজেদের শক্তি ও জনগণের উপর।

১৬। বিভিন্ন গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতার ভবিষ্যত

পূর্ববাংলার ক্ষুদে উৎপাদন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রিকতা, এবং আওয়ামী বিশ্বাসঘাতক ও তার প্রভুদের উৎখাতের পক্ষে জনসমর্থের কারণে বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের জন্ম ও তৎপরতার সৃষ্টি হতে পারে।
এ ধরণের সশস্ত্র তৎপরতা সঠিক মার্কসবাদী-লেনিনবাদী-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত সর্বহারার রাজনৈতিক পার্টির পরিচালনাধীনে আনতে হবে। অন্যথায় এ সকল তৎপরতা ধ্বংস ও নির্মূল হতে বাধ্য।
মার্কসবাদী নেতৃত্ব গ্রহণ না করলে এ সকল গ্রুপ শত্রু-মিত্র নির্ণয়, শত্রু ও নিজেদের অবস্থা বিবেচনা করে যথাযথ সামরিক, সাংগঠনিক, রাজনৈতিক, নিরাপত্তা, শৃংখলা ও অন্যান্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে ব্যর্থ হবে। ফলে তারা পরাজিত ও ধ্বংস হবে।
এ সকল গ্রুপের সৎ ও দেশপ্রেমিকদের উচিত সর্বহারার রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হওয়া, নিজেদের আÍত্যাগ ও দেশপ্রেমকে সার্থক করা।
নিজেদেরকে মার্কসবাদী দাবী করে এরূপ কতগুলো গ্রুপের সশস্ত্র তৎপরতা চলছে। তাদের রাজনৈতিক, সামরিক ও অন্যান্য লাইন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং পূর্ববাংলার বাস্তব অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তাদের রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ ঠিক না হওয়ায় শত্রু মিত্র নির্ণয়, প্রধান শত্রু ও গৌণ শত্রু নির্ধারণ, রিক্রুটমেন্ট, জনগণকে সমাবেশিত ও পরিচালিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভুল হচ্ছে।
শত্রু-মিত্র, প্রধান ও গৌণ শত্রু নির্ধারণে ভুল হওয়ায় সামরিক ক্ষেত্রে তারা এমন সব পদক্ষেপ নেয় যার ফলে মাঝারী চাষী, ধনী চাষী, সামন্তদের, দেশপ্রেমিক অংশের সাথে মিত্রতা প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে বৈরিতা সৃষ্টি করেছে।
গেরিলা বাহিনীর বিকাশের পর্যায়, ঘেরাও, দমন ও তা থেকে আত্মরক্ষার উপায়, উদ্যোগ বজায় রাখার পদ্ধতি, একনাগাড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে কাজ, শহরে গ্রামে ভাল কাজ, বর্ষাকালীন রণনৈতিক আক্রমণ, শীতকালীন আত্মরক্ষা, মানোন্নয়ন ও সুসংবদ্ধকরণ ইত্যাদি বিষয় বা শুন্য থেকে গেরিলা গড়ে তোলা ও বিকাশ সাধনের জন্য গ্রামাঞ্চলে পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থার অপরিহার্যতা তারা বিবেচনা করেনি। বিচ্ছিন্ন পকেট গড়ে তোলে।
ফলে তাদের বিচ্ছিন্ন পকেটসমূহ শত্রু সহজেই ঘিরে ফেলে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।
এ থেকে দেখা যায় সর্বহারা সঠিক বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ব ব্যতীত গেরিলা যুদ্ধ টিকে থাকা, বিকাশ সাধন ও বিজয় অর্জন করতে পারে না।

১৭।। উপসংহার

পূর্ববাংলার বিশেষ অবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখা যায় সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নির্ভুল পরিচালনায় পার্টির নেতৃত্বে একটি বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা, বিকাশ সাধন এবং শেষ পর্যন্ত এর সাহায্যে শত্রুদের পরাজিত ও ধ্বংস করা সম্ভব।
একটি বিপ্লবী সশস্ত্র বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি ‘পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি’র নেতৃত্বে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এ বাহিনী গঠনের সাথে যুক্ত বহু মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান হয়েছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা দ্বারা পরিচালিত হয়ে রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামরিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে সঠক লাইন নির্ধারণ করতে, সর্বহারা শ্রেণীর ও জনগণের স্বার্থরক্ষাকারী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে, এর দ্বারা শত্রুকে পরাজিত ও ধ্বংস করে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল এবং সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে অবশ্যই সক্ষম হবে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের বিজয় অবশ্যম্ভাবী।