কার্ল মার্কস ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। সর্বহারা পথ কর্তৃক বাংলায় ভাষান্তর ৭ম পর্বঃ ১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা।

১৮৯৩ সালের ইতালীয় সংস্করণের ভূমিকা [২৭]

ইতালীয় পাঠকদের প্রতি

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার এর প্রকাশনা আকস্মিকভাবে মিলে যায় ১৮ মার্চ ১৮৪৮ এর মিলান ও বার্লিনের বিপ্লবের সাথে যা ছিল দুটি জাতির সশস্ত্র অভ্যুত্থান, যার একটি ইউরোপ মহাদেশের মধ্যস্থলে অবস্থিত, অন্যটি ভূমধ্যসাগরের মধ্যস্থলে; সেসময় পর্যন্ত দুই জাতি ভাঙন ও অন্তর্দ্বন্দ্বে জর্জরিত, আর একারণে বিদেশী আধিপত্যের অধীনে পড়ে। যেখানে ইতালী ছিলও অস্ট্রিয়ার সম্রাটের অধীন, জার্মানী সর্বরুশীয় জারের অধীনে যা অধিক পরোক্ষ হলেও কম কার্যকর নয়। ১৮ মার্চ ১৮৪৮ এর ফলাফল উভয়ত ইতালী ও জার্মানীকে অপমানের হাত থেকে মুক্ত করে; যদি ১৮৪৮ থেকে ১৮৭১ পর্যন্ত দুই বিরাট জাতি পুনর্গঠিত হয় আর যেকোনভাবেই হোক নিজের পায়ে দাঁড়ায়, সেট ছিল যেমনটা কার্ল মার্কস বলে থাকেন, যে লোকেরা ১৮৪৮ এর বিপ্লবকে দমন করে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারাই ছিল এর দায়ভাগী ব্যাবস্থাপক। [২৮]

সর্বত্রই এই বিপ্লবটা ছিল শ্রমিকশ্রেণীর কাজ; সেই ব্যারকেড তৈরি করে আর রক্তঘাম দিয়ে এটা গড়ে তোলে। সরকার উৎখাতে কেবল প্যারিসীয় শ্রমিকদেরই সুনির্দিষ্ট আকাঙ্খা ছিল বুর্জোয়া শাসন উচ্ছেদ করার। কিন্তু যদিও তাদের নিজ শ্রেণী ও বুর্জোয়াদের মধ্যকার বিদ্যমান বিপজ্জনক বৈরিতা সম্বন্ধে তারা সচেতন ছিল, তখনো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অথবা ব্যাপক ফরাসী শ্রমিকদের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এমন মাত্রায় পৌঁছেনি যাতে একটা সামাজিক পুনর্গঠন সম্ভব হয়। চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাই, বিপ্লবের ফলগুলি পুঁজিপতি শ্রেণী আহরণ করে। অন্য দেশে যথা ইতালী, জার্মানী, অস্ট্রিয়াতে শ্রমিকরা একেবারে প্রথম থেকেই বুর্জোয়াদেরকে ক্ষমতায় বসানো ছাড়া আর কিছু করেনি। কিন্তু কোন দেশেই জাতীয় স্বাধীনতা ব্যতীত বুর্জোয়াদের শাসন সম্ভব নয়। তাই ১৮৪৮ এর বিপ্লবকে জাতিসমূহের ঐক্য ও স্বশাসন এনে দিতে হয় সেই সব দেশের জন্য যাদের তখন পর্যন্ত তা ছিলনা যথা ইতালী, জার্মানী ও হাঙ্গেরি। এক পর্যায়ে পোল্যান্ড তা অনুসরণ করবে।

তাই, ১৮৪৮ সালের বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক না হলেও সেই পথে নিয়ে যায় আর তার মাটি প্রস্তত করে। সকল দেশের বৃহদায়তন শিল্পের উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে বুর্জোয়া শাসন এক জনবহুল, ঘনীভূত আর শক্তিশালী সর্বহারা শ্রেণী সৃষ্টি করে। সে তাই জন্ম দিয়েছে ইশতেহারের ভাষায় তার কবর খোদাইকারীদের। প্রত্যেক দেশের স্বশাসন আর ঐক্য পুনরুদ্ধার না করে, সর্বহারা শ্রেণীর আন্তর্জাতিক মিলন অর্জন অসম্ভব হবে, অথবা অসম্ভব হবে সাধারণ লক্ষ্যের দিকে এইসব জাতির শান্তিপূর্ণ ও বুদ্ধিমান সহযোগিতা। একবার কল্পনা করুন ১৮৪৮ এর পূর্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অধীনে ইতালীয়, হাঙ্গেরীয়, জার্মান, পোলীয় ও রুশী শ্রমিক যৌথ আন্তর্জাতিক কর্মকাণ্ড যদি থাকত!

তাই ১৮৪৮ সালের লড়াইগুলো বৃথা লড়তে হয়নি। আমাদেরকে বিপ্লবী যুগ থেকে বিচ্ছিন্নকারী পঁয়তাল্লিশ বছরও উদ্দেশ্যহীনভাবে অতিক্রান্ত হয়নি। ফলগুলো পেঁকে উঠছে, আর আমার ইচ্ছা হয় যে ইতালীয় অনুবাদের এই সংস্করণ ইতালীয় সর্বহারা শ্রেণীর বিজয়বার্তা নিয়ে আসুক যেমনটা মূল প্রকাশনা আন্তর্জাতিক বিপ্লবের জন্য করেছে। অতীতে পুঁজিবাদ যে বিপ্লবী ভূমিকা পালন করেছে তার প্রতি ইশতেহার পূর্ণ সুবিচার করেছে। প্রথম পুঁজিবাদী দেশ ছিল ইতালী। সামন্তবাদী মধ্যযুগের অবসান আর আধুনিক পুঁজিবাদী যুগের সূচনা এক মহান ব্যক্তির দ্বারা চিহ্নিত হয়ঃ একজন ইতালীয় দান্তে, যিনি উভয়ত মধ্য যুগের শেষ আর আধুনিক কালের প্রথম কবি। ১৩০০ সালে যেমন, আজকেও এক নতুন ঐতিহাসিক যুগ ইশারা করছে। ইতালী কি আমাদের এক নতুন দান্তে দেবে যিনি এই নতুন সর্বহারা যুগের জন্মলগ্নকে চিহ্নিত করবেন?

ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস

লন্ডন

১ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৩