কার্ল মার্কস ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। সর্বহারা পথ কর্তৃক বাংলায় ভাষান্তর ৬ষ্ঠ পর্বঃ ১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা।

১৮৯২ সালের পোলীয় সংস্করণের ভূমিকা [২৫]

কমিউনিস্ট ইশতেহারের যে একটা নতুন পোলীয় সংস্করণের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাতে অনেক কথা মনে আসে।

সর্বাগ্রে এটা উল্লেখ্য যে ইশতেহার যেন ইদানিং ইউরোপ মহাদেশে বৃহদায়তন শিল্পের বিকাশের একটা সূচকে পরিণত হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট দেশে যে অনুপাতে বৃহদায়তন শিল্প সম্প্রসারিত হয়, সেই অনুপাতে সেদেশের শ্রমিকদের মধ্যে মালিক শ্রেণীর তুলনায় শ্রমিক শ্রেণীর অবস্থান সংক্রান্ত জ্ঞানলাভের আকাঙ্খা বাড়ে, তাদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বিস্তৃত হয় আর ইশতেহারের চাহিদা বাড়ে। তাই, কোন দেশের শ্রমিক আন্দোলনের অবস্থাই শুধু নয় বরং বৃহদায়তন শিল্পের বিকাশও অনেকটা নিঃখুঁতভাবে মাপা যায় সেদেশের ভাষায় কত কপি ইশতেহার প্রচারিত হয়েছে তার দ্বারা।

সে হিসেবে, নয়া পোলীয় সংস্করণ পোলীয় শিল্পের একটা নিশ্চিত অগ্রগতির ইঙ্গিত করে। আর এবিষয়ে কোন সন্দেহ থাকতে পারেনা যে দশ বছর আগে যে সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল তা থেকে এই প্রগতি সতিই ঘটেছে। রুশী পোল্যান্ড, কংগ্রেসী পোল্যান্ড [২৬] রুশ সাম্রাজ্যের বৃহৎ শিল্পাঞ্চলে পরিণত হয়েছে। যেখানে রুশ বৃহদায়তন শিল্প বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে – একটা অংশ ফিনল্যান্ডের উপসাগরের চারদিকে, আরেকটি অংশ কেন্দ্রে (মস্কো ও ভ্লাদিমির), তৃতীয় অংশ কৃষ্ণ ও আজভ সাগরের তীর জুড়ে, আর অন্যগুলো অন্যত্র – পোলীয় শিল্প তুলনামূলক ছোট এলাকায় চেপে গেছে আর এরকম কেন্দ্রীভবন থেকে উদ্ভূত সুবিধা ও অসুবিধা উভয়ই সে ভোগ করে। পোলীয়দের রুশীতে রূপান্তর করার তাদের প্রচণ্ড আকাঙ্খা থাকা সত্ত্বেও, প্রতিযোগী রুশ শিল্পমালিকরা যখন পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে রক্ষন শুল্ক আরোপ করে তখন তারা এই সুবিধার ব্যাপারটাই স্বীকৃতি দেয়। পোলীয় শিল্পমালিক ও রুশ সরকার উভয়ের জন্যই অসুবিধা প্রতিফলিত হয় পোলীয় শ্রমিকদের মধ্যে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আর ইশতেহারের জন্য বাড়ন্ত চাহিদার মধ্যে।

কিন্তু পোলীয় শিল্পের যে দ্রুত বিকাশ রাশিয়াকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে তা আবার পোলীয় জনগণের অফুরান প্রাণশক্তির প্রকাশ আর ঝুলে থাকা জাতীয় পুনপ্রতিষ্ঠার নতুন নিশ্চয়তা। আর একটি স্বাধীন শক্তিশালী পোল্যান্ডের পুনপ্রতিষ্ঠা শুধু পোলীয়দের চিন্তার বিষয় নয় বরং আমাদেরও। ইউরোপীয় জাতিসমূহের আন্তরিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্ভব কেবল যদি এই জাতিসমূহ নিজেদের দেশে পূর্ণ স্বায়ত্বশাসিত হয়। ১৮৪৮ সালের বিপ্লব সর্বহারা শ্রেণীর পতাকার অধীনে সংঘটিত হলেও, শেষ পর্যন্ত সর্বহারা যোদ্ধাদেরকে বুর্জোয়াদের কাজটাই কেবল করতে হয়েছে, ইতালী, জার্মান ও হাঙ্গেরীর স্বাধীনতা অর্জিত হয় তার পবিত্র কর্মসম্পাদক লুই বোনাপার্ট ও বিসমার্কের মাধ্যমে; কিন্তু পোল্যান্ড যে কিনা ১৭৯২ হতে এই বিপ্লবের জন্য ঐ তিন দেশের চেয়ে বেশি করেছে, ১৮৬৩ সালে দশগুণ শক্তিশালী রুশ বাহিনীর গ্রাসে পড়ার সময় তার নিজ সম্পদের উপরই কেবল ভরসা করতে হয়। অভিজাত সম্প্রদায় না তো পোলীয় স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারত, না তা পুন অর্জন করতে পারত; আজকে বুর্জোয়ার কাছে, কম করে বললেও, সে স্বাধীনতা হচ্ছে অবাস্তব। তাসত্ত্বেও ইউরোপীয় জাতিসমূহের সুষম সহযোগিতার জন্য এটা প্রয়োজন। তা কেবল অর্জন করা যেতে পারে তরুণ পোলীয় সর্বহারা শ্রেণী কর্তৃক, আর তার হাতেই এটা নিরাপদ। বাকী ইউরোপের শ্রমিকদের পোল্যান্ডের স্বাধীনতা ততটাই প্রয়োজন যতটা পোলীয় শ্রমিকদের নিজেদের প্রয়োজন।

এফ. এঙ্গেলস, লন্ডন, ১০ ফেব্রুয়ারী ১৮৯২