কার্ল মার্কস ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস। কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। সর্বহারা পথ কর্তৃক বাংলায় ভাষান্তর ৫ম পর্বঃ ১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা।

১৮৯০ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকা [২১]

উপরের কথাগুলো লেখার পর, [২২] ইশতেহারের একটা নতুন জার্মান সংস্করণ আবারো প্রয়োজন হয়েছে, আর ইশতেহারের অনেক কিছু ঘটে গেছে যার বিবরণী এখানে থাকা দরকার।

১৮৮২ সালে ভেরা জাসুলিচ কর্তৃক দ্বিতীয় রুশ অনুবাদ আবির্ভূত হয় জেনেভায় ১৮৮২ সালে; ঐ সংস্করণের ভূমিকা মার্কস আর আমি লিখেছিলাম। দুর্ভাগ্যবশত, মূল জার্মান পান্ডুলিপি ধ্বংস হয়ে গেছে; আমাকে তাই রুশ থেকে পুন অনুবাদ করতে হবে, যা কোন ভাবেই পাঠকে উন্নত করবে না। [২৩] এতে লেখা আছেঃ

বাকুনিন কর্তৃক অনুদিত কলকল মুদ্রন কর্তৃক মুদ্রিত হয়ে কমিউনিস্ট ইশতেহারের প্রথম রুশ সংস্করণ ষাটের দশকের শুরুতে প্রকাশিত হয়। তারপর পশ্চিমারা কেবল এর মধ্যে (ইশতেহারের রুশ সংস্করণে) দেখে থাকতে পারে সাহিত্যিক কৌতুহল-বস্তু মাত্র। এরকম একটি দৃষ্টিভঙ্গি আজকে অসম্ভব।

সেসময় সর্বহারা শ্রেণী কতটাই না সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র দখল করে ছিল (ডিসেম্বর ১৮৪৭) তা সর্বাধিক পরিষ্কারভাবে দেখিয়েছে ইশতেহারের শেষ অংশঃ বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন বিরোধী পার্টিসমূহের সাথে সম্পর্কের প্রশ্নে কমিউনিস্টদের অবস্থান। রাশিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্টের কথাই নেই এখানে। এটা ছিল এমন একটা সময় যখন রাশিয়া ছিল সকল ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার সর্বশেষ বৃহৎ রিজার্ভ যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অভিবাসনের মাধ্যমে ইউরোপ থেকে উদ্বৃত্ত সর্বহারা শক্তিসমূহ শুষে নিয়েছে। উভয় দেশই ইউরোপকে কাঁচামাল সর্বরাহ করত আর ইউরোপের শিল্পজাত সামগ্রীর বিক্রয়ের বাজার ছিল। সেসময় উভয় দেশই ছিল কোন না কোন ভাবে বিদ্যমান ইউরোপীয় ব্যবস্থার ভিত্তি।

আজকে কতই না ভিন্ন! ইউরোপীয় অভিবাসনই উত্তর আমেরিকাকে এক অতিকায় কৃষি উৎপাদনের যোগ্য করে তুলেছে, যার প্রতিযগিতা ইউরোপীয় ক্ষুদ্র ও বৃহৎ নির্বিশেষে ভুমি সম্পত্তির খোদ ভিত্তিকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। তার সাথে এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সক্ষম করে তুলেছে তার বিপুল শিল্প সম্পদকে এমন এক শক্তি ও মাত্রায় কাজে লাগাতে যা অচিরেই শিল্প ক্ষেত্রে পশ্চিম ইউরোপের বিশেষত ইংল্যান্ডের আজ পর্যন্ত যে একচেটিয়া রয়েছে তাকে ভেঙে ফেলবে। উভয় পরিস্থিতি খোদ আমেরিকার উপরই বিপ্লবী উপায়ে প্রতিক্রিয়া করে। সমগ্র রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি যে কৃষকদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ভুমি মালিকানা তা ক্রমে ক্রমে অতিকায় খামারগুলোর প্রতিযোগিতার কাছে হার মানছে; একইসাথে শিল্পাঞ্চলগুলোতে ব্যাপক সর্বহারা শ্রেণীর সমাবেশ ঘটছে আর বিপুল পুঁজির কেন্দ্রীভবন ঘটছে প্রথমবারের মত।

আর এখন রাশিয়া! ১৮৪৮-৪৯ এর বিপ্লবের সময় ইউরোপীয় রাজন্যবর্গই শুধু নয়, ইউরোপীয় বুর্জোয়ারাও সদ্য জাগরণরত সর্বহারা শ্রেণীর হাত থেকে মুক্তির একমাত্র পথ খুঁজে পেয়েছিল রুশ হস্তক্ষেপের মধ্যে। জারকে ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়ার প্রধান ঘোষণা করা হয়েছিল। আজ সে গ্যাচিনায় বিপ্লবের কাছে যুদ্ধবন্দী। আর রাশিয়া হয়েছে ইউরোপের বিপ্লবী তৎপরতার অগ্রপথিক।

“কমিউনিস্ট ইশতেহার ঘোষণা করেছিল আধুনিক বুর্জোয়া সম্পত্তির অনিবার্য ধ্বংস। কিন্তু রাশিয়ায় আমরা পাই, দ্রুত বিকাশমান পুঁজিবাদী জুয়াচুরি আর সদ্য বিকাশমান বুর্জোয়া ভুসম্পত্তির মুখোমুখি অর্ধেকের বেশী ভুমি কৃষকদের সাধারণ মালিকানাধীন। এখন প্রশ্ন হচ্ছেঃ যদিও ব্যাপকভাবে দমিত তথাপি ভুমির আদিম সাধারণ মালিকানার একটি ধরণ এই যে রুশ অবশ্চিনা [গ্রামীণ সমাজ – সর্বহারা পথ], তা কি সরাসরি উচ্চতর কমিউনিস্ট সাধারণ মালিকানার দিকে যাবে? নাকি বিপরীতে পশ্চিমের ঐতিহাসিক বিবর্তনের ধারা গঠনকারী একই ধ্বংসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে?

“এর একমাত্র যে উত্তর আজ সম্ভব তা হচ্ছেঃ যদি রুশ বিপ্লব পশ্চিমের সর্বহারা বিপ্লবের সংকেত হয়, যাতে উভয় উভয়ের পরিপূরক হয়, বর্তমান রুশ ভুমির সাধারণ মালিকানা একটা কমিউনিস্ট বিকাশের সূচনা বিন্দু হিসেবে সেবা করতে পারে।

কার্ল মার্কস, ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস

লন্ডন

২১ জানুয়ারী ১৮৮২”

প্রায় একই তারিখে জেনেভায় একটি নতুন পোলীয় সংস্করণ আবির্ভূত হয়ঃ মেনিফেস্ত কম্যুনিস্তিজনি।

এক নতুন ড্যানিশ সংস্করণ পাওয়া যায় ১৮৮৫-এ কোপেনহেগেন-এর “সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক বিব্লিওথেক”-এ; দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটা সম্পূর্ণ ছিলনা; কিছু জরুরী অনুচ্ছেদ যা অনুবাদকের কাছে কঠিন মনে হয়েছে তা বাদ দেয়া হয়েছে, আর তার উপর যত্নের অভাব এখানে ওখানে দেখা যায়, এসবই দুঃখজনকভাবে লক্ষ্যনীয় যা এই ইঙ্গিত দেয় যে অনুবাদক যদি আর একটু কষ্ট করতেন তিনি একটা চমৎকার কর্ম সম্পাদন করতে পারতেন।

একটা নতুন ফরাসী অনুবাদ প্যারিসে ১৮৮৬ সালে “লা সোশ্যালিস্ত”-এ প্রকাশিত হয়। আজ পর্যন্ত এটাই শ্রেষ্ঠ সংস্করণ।

এ থেকে পরে মাদ্রিদে একটা স্প্যানিশ সংস্করণ প্রস্তুত ও প্রকাশ হয় একই বছর প্রথমে মাদ্রিদের এল সোশ্যালিস্তা আর তারপর পাম্ফলেট আকারে পুন প্রকাশিত হয়ঃ /Manifiesto del Partido Comunista/ por Carlos Marx y F. Engels, Madrid, Administración de /El Socialista/, Hernan Cortés 8।

একটা মজার ব্যাপার হিসেবে আমি উল্লেখ করতে পারি যে একটা আর্মেনিয়ান অনুবাদ কনস্টান্টিনোপলে এক প্রকাশকের কাছে প্রকাশনার জন্য দেয়া হয়। কিন্তু ভালমানুষটি মার্কসের নাম বহনকারী বই বের করতে সাহস পেলনা, আর সে অনুবাদককে পরামর্শ দিল সে যেন লেখক হিসেবে নিজের নাম দেখায়—যাতে অনুবাদক রাজি হলেন না।

প্রথমে একটি তারপর আরেকটি কমবেশী খুঁতযুক্ত আমেরিকান অনুবাদ বারংবার ইংল্যান্ডে পুনমুদ্রিত হল, সবশেষে ১৮৮৮ সালে একটা সঠিক সংস্করণ বের হল। এটা আমার বন্ধু স্যামুয়েল মুর করেন, আর ছাঁপাখানায় যাওয়ার আগে আমরা দুজনে মিলে আরেকবার এটা দেখেছি। এর শিরোনাম ছিলঃ কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার। কার্ল মার্কস ও ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস কর্তৃক। লেখক কর্তৃক অনুমোদিত ইংরেজী অনুবাদ। ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস কর্তৃক সম্পাদিত ও টীকাযুক্ত। ১৮৮৮, লন্ডন, উইলিয়াম রীভস, ১৮৫ ফ্লিট স্ট্রীট, ইসি। আমি বর্তমান সংস্করণে সেই সংস্করণের কিছু টীকা অন্তর্ভুক্ত করেছি।

ইশতেহারের একটা নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে। প্রকাশের সময় তখনো সংখ্যায় বিপুল নয় এমন অগ্রগামী বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী কর্তৃক উৎসাহসহ গৃহীত হয়েছিল (একথা প্রথম সংস্করণের ভূমিকায় যেসব অনুবাদের কথা বলা হয়েছে তা দ্বারা প্রমাণিত হয়), শীঘ্রই তা জুন ১৮৪৮-এ প্যারিসীয় শ্রমিকদের পরাজয়ের ফলস্বরূপ প্রতিক্রিয়া কর্তৃক পশ্চাদে নিক্ষিপ্ত হয়, আর শেষ পর্যন্ত নভেম্বর ১৮৫২ সালে কলোন কমিউনিস্টদের বিচারের মাধ্যমে “আইন অনুসারে” নিষিদ্ধ হয়। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল যে শ্রমিক আন্দোলন তার লোকচক্ষু থেকে উধাও হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ইশতেহারও অন্তরালে চলে গেল।

যখন ইউরোপের শ্রমিক শ্রেণী শাসক শ্রেণীর ক্ষমতার উপর নতুন আক্রমণ হানার মত যথেষ্ট শক্তি পুনরায় অর্জন করল, শ্রমজীবি মানুষের আন্তর্জাতিক সমিতি উদ্ভূত হল। এর লক্ষ্য ছিল ইউরোপ ও আমেরিকার সমগ্র জঙ্গী শ্রমিক শ্রেণীকে এক বিরাট বাহিনীতে সুসংহত করা। তাই ইশতেহারে স্থাপিত নীতিমালার উপর এটা দাঁড়াতে পারলনা। এটা বাধ্য ছিল এমন এক কর্মসূচী নিতে যা দরজা বন্ধ রাখবেনা ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নগুলির জন্য, ফরাসী, বেলজীয়, ইতালীয় ও স্প্যানীয় প্রুঁধোপন্থীদের জন্যও আর জার্মান লাসালপন্থীদের জন্য [এঙ্গেলসের নোটঃ লাসাল ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কাছে সবসময়ই মার্কসের একজন ‘শিষ্য’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন, আর সেই হিসেবে, ইশতেহারই তার মতের ভিত্তি। তার অনুসারীদের কথা সম্পূর্ণ আলাদা যারা তার রাষ্ট্রীয় সমর্থিত উৎপাদকদের সমবায়ের দাবির বাইরে যায়নি আর যারা সমগ্র শ্রমিকশ্রেণীকে বিভক্ত করে রাষ্ট্রীয় সহযোগিতার সমর্থক আর আত্মসহায়তার সমর্থক এই দুইয়ে]। এই কর্মসূচী – আন্তর্জাতিকের নিয়মাবলীর ভূমিকা মার্কস এমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ হাতে রচনা করেলেন যা বাকুনিন ও নৈরাজ্যবাদীরা পর্যন্ত স্বীকার করে। ইশতেহারে স্থাপিত ভাবধারার চূড়ান্ত বিজয়ের জন্য মার্কস একমাত্র ও শুধুমাত্র শ্রমিক শ্রেণীর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উপর নির্ভর করেছিলেন, ঐক্যবদ্ধ কর্মতৎপরতা ও আলোচনা থেকে যার উদ্ভব ছিল অনিবার্য। পুঁজির বিরুদ্ধে সংগ্রামের ঘটনাধারা ও বিপর্যয়সমূহ, সফলতার চেয়ে এমনকি পরাজয়সমূহ যোদ্ধাদের কাছে তাদের এতদিনকার টোটকা ঔষধের অপর্যাপ্ততা না দেখিয়ে পারেনা আর তাদের মনকে অধিকতর গ্রহণমুখী করে তোলে শ্রমিকদের মুক্তির জন্য সত্যিকার শর্তসমূহের সামগ্রিক উপলব্ধিতে। আর মার্কস ছিলেন সঠিক। ১৮৭৪ সালের শ্রমিক শ্রেণী আন্তর্জাতিকের ভেঙে দেওয়ার প্রেক্ষিতে ১৮৬৪ সালে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠার সময়ের শ্রমিক শ্রেণী থেকে সবমিলিয়ে অন্যরকম হয়ে উঠে। প্রুঁধোবাদ লাতিন দেশগুলিতে আর জার্মানীর স্বকীয় লাসালবাদ শুকিয়ে মরছিল, আর এমনকি তখনকার চরম রক্ষণশীল ইংরেজ ট্রেড ইউনিয়নগুলি এমন একটা বিন্দুর দিকে এগুচ্ছিল যেখানে ১৮৮৭ সালে সোয়ানশি কংগ্রেসে তাদের সভাপতি তাদের পক্ষ থেকে বলেঃ “মহাদেশীয় সমাজতন্ত্র আমাদেরকে কাছে আর বিভীষিকা নেই।” তথাপি ১৮৮৭ সালে মহাদেশীয় সমাজতন্ত্র ছিল ইশতেহার কর্তৃক তুলে ধরা তত্ত্ব মাত্র। তাই, কিছু পরিমাণে, ইশতেহারের ইতিহাস ১৮৪৮ সাল থেকে আধুনিক শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসকেই প্রতিফলিত করে। বর্তমানে নিঃসন্দেহে এটা সকল সমাজতান্ত্রিক সাহিত্যের মধ্যে সর্বাধিক প্রচারিত, সর্বাধিক আন্তর্জাতিক সৃষ্টি, সাইবেরিয়া থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত সকল দেশের কোটি কোটি শ্রমিকের স্বীকৃত সাধারণ কর্মসূচি।

তথাপি, যখন এটা রচিত হয় আমরা একে সমাজতান্ত্রিক ইশতেহার বলতে পারতাম না। ১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্রী বলতে বোঝাতো দুই ধরণের লোককে। একদিকে বহুবিধ ইউটোপীয় মততন্ত্রের অনুগামীরা যথা, ইংল্যান্ডে ওয়েনপন্থীরা, ফ্রান্সে ফুরিয়েপন্থীরা, উভয়ে স্রেফ একটা গোষ্ঠীতে ইতিমধ্যে সীমিত হয়ে ততদিনে ক্রমান্বয়ে শুকিয়ে মরছিল। অন্যদিকে, সমাজের নানা বিচিত্র সব হাতুড়েরা তাদের সকল প্রকার সর্বরোগহর টোটকা ঔষধ ও জোড়াতালি দ্বারা সামাজিক অবিচারের অবসানের কথা বলে পুঁজি ও মুনাফার সামান্যতম ক্ষতি না করে। উভয় ক্ষেত্রের লোকেরাই ছিল শ্রমিক শ্রেণীর বাইরের, যারা “শিক্ষিত” শ্রেণীগুলির সমর্থনের দিকে তাকিয়ে ছিল। স্রেফ রাজনৈতিক বিপ্লব যথেষ্ট নয় এটা নিশ্চিত হয়ে শ্রমিক শ্রেণীর যে অংশ সেদিন সমাজের আমূল পুনর্গঠনের দাবি তোলে, সে অংশটা সেসময় নিজেকে কমিউনিস্ট বলত। এটা ছিল অমার্জিত, নিতান্ত সহজবোধের, প্রায়শই অনেকটা স্থূল কমিউনিজম মাত্র। তথাপি ইউটোপীয় কমিউনিজমের দুটি ধারা সৃষ্টি করার মত শক্তি এর ছিলঃ ফ্রান্সে কাবের “আইকেরীয়” কমিউনিজম আর জার্মানীতে ভাইতলিং-এর কমিউনিজম। তাই, সমাজতন্ত্র ১৮৪৭ সালে ছিল একটা মধ্যবিত্ত আন্দোলন, কমিউনিজম ছিল শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন। সমাজতন্ত্র ছিল মহাদেশে অন্ততঃ “সম্মানিত”; আর কমিউনিজম ছিল খুবই বিপরীত। আর যেহেতু আমাদের দৃঢ় মত প্রথম থেকেই ছিল এই যে “শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি হতে শ্রমিক শ্রেণীর নিজেরই কাজ”, তাই আমাদের কোনও দ্বিধা ছিলনা এই দুই নামের মধ্যে আমরা কোনটা নেব। আমরা আজ পর্যন্ত এ নাম বর্জন করার কথা ভাবিওনি।

“দুনিয়ার মজদুর এক হও!” আজ থেকে বিয়াল্লিশ বছর আগে প্রথম প্যারিসীয় বিপ্লবের প্রাক্কালে যেখানে সর্বহারা শ্রেণী নিজ দাবিদাওয়া নিয়ে দাঁড়ালো আমরা তখন পৃথিবীর সামনে এই কথা ঘোষণা করি, অল্প কিছু কন্ঠেই তার প্রতিধ্বনি উঠেছিল। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৮৬৪তে অধিকাংশ পশ্চিম ইউরোপীয় দেশের সর্বহারা শ্রেণী হাত মেলালো আন্তর্জাতিক শ্রমজীবি মানুষের সমিতির সাথে, যে সমিতি এক গৌরবোজ্বল স্মৃতির। এটা সত্যি যে আন্তর্জাতিক টিকে ছিল কেবল নয় বছর। কিন্তু এটা সারা দুনিয়ার সর্বহারা শ্রেণীর যে চির ঐক্য সৃষ্টি করেছিল তা এখনো জীবন্ত, আর যে কোন সময়ের চেয়ে শক্তিশালী, আজকের দিনই তার সর্বোত্তম স্বাক্ষী। কারণ আজকে আমি যখন এই লাইনগুলি লিখছি, ইউরোপীয় ও আমেরিকান সর্বহারা শ্রেণী তার যুদ্ধ ক্ষমতা বিচার করে দেখচে, প্রথমবারের মত তারা সমাবেশিত, সমাবেশিত একটি একক বাহিনী হিসেবে, একটি একক পতাকার নীচে, একমাত্র আশু লক্ষ্যেঃ আন্তর্জাতিকের জেনেভা কংগ্রেস ১৮৬৬ সালে ঘোষণা করেছে, আর আবারো ১৮৮৯ সালে প্যারিস শ্রমিক কংগ্রেস ঘোষণা করেছে [২৪] সেইভাবেই আট ঘন্টা কর্মদিবসের আইন পাশ করে তা চালু করতে হবে। আর আজকের দৃশ্য দুনিয়ার পুঁজিবাদী ও ভুস্বামীদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে যে সত্যিই সকল দেশের শ্রমিকেরা এক হয়েছে।

আমার পাশে থেকে এটা নিজের চোখে দেখার জন্য মার্কস যদি আজকে জীবিত থাকতেন!

ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস

লন্ডন

১ মে ১৮৯০