সিরাজ সিকদার রচনাঃ জনাব বারীর বক্তব্যের উপর কতিপয় মন্তব্য (সম্ভবতঃ ১৯৭৪)

সিরাজ সিকদার রচনা

জনাব বারীর বক্তব্যের উপর
কতিপয় মন্তব্য

(সম্ভবতঃ ১৯৭৪)

sikder

টীকাঃ

উৎপাদনের ব্যবস্থার ( Mode of Production) উপর সমাজের উপরি কাঠামো ( Superstructure) দাঁড়িয়ে আছে। অর্থাৎ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, সংস্কৃতি, চেতনা (উপরিকাঠামো) সামাজিক ভিত্তি উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে উৎপাদন সম্পর্ক ও উৎপাদন শক্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব।
উৎপাদক শক্তি প্রতিনিয়ত বিকাশ লাভ করে। উৎপাদক শক্তির বিকাশের সাথে উৎপাদন সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে, উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় যাতে উৎপাদন শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
উৎপাদন ব্যবস্থার মালিকরা উপরিকাঠামোও নিয়ন্ত্রণ করে। তারা পুরানো উৎপাদন ব্যবস্থা (যা তাদের জন্য সুবিধাজনক) টিকিয়ে রাখার জন্য উপরিকাঠামোকে উৎপাদক শক্তির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে।
এ কারণে উৎপাদন সম্পর্ক পরিবর্তনের সংগ্রাম পরিচালিত হয় উপরিকাঠামোর বিরুদ্ধে, প্রধানতঃ রাষ্ট ও তার প্রধান উপাদান সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে।
এ সংগ্রামের ফলে পুরনো উৎপাদন সম্পর্ক ও উপরিকাঠামো পরিবর্তিত হয়, নতুন উৎপাদন সম্পর্ক ও উপরি কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।
এভাবে সমাজ প্রতিনিয়ত বিকাশ লাভ করছে। কাজেই উপরিকাঠামোর চেতনা-সংগ্রাম-চিন্তাধারার উৎস খুজতে হবে সমাজের ভিত উৎপাদন ব্যবস্থার মাঝে, সম্পত্তির মালিকানার সম্পর্কের মাঝে। ইহা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সাধারণ শিক্ষা।

কয়েকটি উদ্ধৃতিঃ

“সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার যেরূপ, সেরূপ হবে সমাজ, এর ধারণা, চিন্তা, এর রাজনৈতিক মতবাদ এবং প্রতিষ্ঠানসমুহ।”
“সমাজের ইতিহাসের সূত্র মানুষের মনের মাঝে খুঁজলে হবে না, ধারণা ও চিন্তার মাঝে খুঁজলে হবে না। খুঁজতে হবে একটি ঐতিহাসিক যুগে সমাজে কী উৎপাদন ব্যবস্থা ছিল তার মাঝে। অবশ্যই খুজতে হবে সমাজের অর্থনৈতিক জীবনের মাঝে।”
“উৎপাদন ব্যবস্থা সামজিক, রাজনৈতিক এবং সাস্কৃতিক জীবনকে সাধারণভাবে নির্ণয় করে।”
“মানুষের চেতনা তার সামাজিক অস্তিত্বকে নির্ণয় করে না। সামাজিক অস্তিত্ব তার চেতনাকে নির্ণয় করে।”
– স্ট্যালিন,
ঐতিহাসিক ও দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ।

জনাব বারী হক-তোয়াহাদের সাথে যুক্ত ছিলেন।
বর্তমানে তিনি একটি পৃথক গ্রুপ হিসাবে বিরাজ করছেন। তিনি দাবী করেন সর্বহারা বিপ্লবীদের ঐক্যের জন্য তিনি চেষ্টা করছেন।
তিনি একটি বক্তব্য তৈরী করেছেন।
তার উপর কতিপয় মন্তব্যঃ
বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা মুসলিম ধর্মাবলম্বী সামন্তদের উৎখাত করে পাক-ভারতের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করে রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের উপর নিয়ন্ত্রণ কায়্রেম করে।
এভাবে তারা পাক-ভারতের সমাজের উপরিকাঠামো দখল করে।
বৃটিশরা মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের উৎখাত করে পাক-ভারতের উৎপাদন ব্যবস্থার উপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।
বৃটিশ উপনিবেশবাদীরা উৎপাদন ব্যবস্থায় ও উপরিকাঠামোতে ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য বজায় রাখে, এক ধর্মাবলম্বী দালালদের উপর নির্ভর করে অন্য ধর্মাবলম্বী জনগণের উপর নিপীড়ণ চালায়।
এর উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক মনোভাব সৃষ্টি করা, দাঙ্গা–রায়ট বাধানো, জনগণকে অনৈক্যবদ্ধ রাখা এবং তাদের উপর শোষণ ও শাসন পরিচালনা সহজতর করা।
ইহা বৃটিশদের প্রতিক্রিয়াশীল “ভাগ কর, শাসন কর” নীতি বলে পরিচিত।
উৎপাদন ব্যবস্থায় ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য ও নিপীড়নের অবসান করার এবং যথাযথ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা উপরিকাঠামোতে সংগ্রাম পরিচালনা করে।
এর ফল স্বরূপ উপরিকাঠামোতে ধর্মীয় নিপীড়ন বিরোধী চিন্তা ও সংগ্রামের উদ্ভব হয়।
সর্বহারার নেতৃত্ব না থাকায় জনগণের ধর্মীয় নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রমের নেতৃত্ব গ্রহণ করে পাক-ভারতের আমলাতান্ত্রিক বুর্জোয়া ও সামন্তবাদীরা। তারা জনগণকে ধর্মীয় নিপীড়নের মূল কারণ বৃটিশ উপনিবেশবাদ ও তার দালালদের বিরুদ্ধে পরিচালনা না করে সাম্প্রদায়িকতা, রায়ট, দাঙ্গার দিকে পরিচালনা করে।
ফলে রায়ট-দাঙ্গার উদ্ভব হয়, জনগণের মাঝে অবৈর ধর্মীয় দ্বন্দ্ব বৈরী রূপ ধারণ করে।
সর্বহারার নেতৃত্বে পাক-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হলে ধর্মীয় নিপীড়নকারী প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে (বৃটিশ উপনিবেশবাদ ও তার দালাল প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ত ও আমলাতান্ত্রিক পুজিপতিদের) সংগ্রাম পরিচালিত হতো এবং ধর্মীয় নিপীড়নের অবসানের ভিত্তিতে অখন্ড পাক-ভারত গঠিত হতো। ভাষাভিত্তিক জাতীয় বিকাশের জন্য আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রদান করা হতো।
কাজেই উপরি কাঠামো, চেতনায় দ্বিজাতি তত্ত্বের (হিন্দু-মুসলিম ধর্মের ভিত্তিতে দুই জাতি এ তত্ত্ব) উদ্ভবের কারণ উৎপাদনের ব্যবস্থায় ধর্মের ভিত্তিতে বৈষম্য ও নিপীড়নের মাঝে নিহিত।
দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাক-ভারতের বিভক্তির জন্য শুধু প্রতিক্রিয়াশীলদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে চলবে না। কারণ, প্রতিক্রিয়াশীলরা তাদের নিয়মমত প্রতিক্রিয়াশীল কাজ করে যাবে।
দোষ হচ্ছে পাক-ভারতের সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির ব্যর্থতারও। তারা সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা এবং এ বিপ্লবের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়।
পূর্ববাংলার বাঙালী-বিহারী সংঘাত একই কারণে ঘটে। পূর্ব বাংলার উৎপাদন ব্যবস্থায় অবাঙালীরা প্রাধান্য অর্জন করে। এটা সম্ভব হয় পূর্ববাংলা তথা পাকিস্তানের উপরিকাঠামো তাদের হাতে থাকায়।
পূর্ব বাংলার জনগণ উপরিকাঠামোতে সংগ্রাম করে উৎপাদন ব্যবস্থায় নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থা সৃষ্টির জন্য।
জনগণের এ সংগ্রামে সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্ব না থাকায় বুর্জোয়ারা এ সংগ্রামের নেতৃত্ব দখল করে এবং একে বিপথে পরিচালনা করে।
ফলে ভাষা ভিত্তিক বাঙালী-বিহারী দাঙ্গা–রায়ট বাধে, জনগণের মধ্যকার অবৈর ভাষাভিত্তিক দ্বন্দ্ব বৈর রূপ লাভ করে; বহু জনগণ প্রাণ হারায়, ধন সম্পত্তি বিনষ্ট হয়, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াশীলদের সুবিধা হয়।
কাজেই বাঙালী–বিহারী সংঘাতের কারণ নিহিত আছে উৎপাদন ব্যবস্থার মাঝে।
অর্থাৎ, সাম্প্রদায়িকতা, দ্বিজাতি তত্ত্ব, বাঙালী–বিহারী দাঙ্গা প্রভৃতির কারণ শুধু ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত-চেতনা-বাইরের কারণ বললে আধিবিদ্যক ভূল হবে; এর ভিত্তি ছিল উৎপাদন ব্যবস্থার পার্থক্য, বৈষম্য ও নিপীড়নের মাঝে।
উৎপাদন ব্যবস্থার কোন বৈষম্য, নিপীড়ন না থাকলে ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত পার্থক্য উপরিকাঠামোর রাষ্ট্র, রাজনীতিতে কোন বৈষম্য সৃষ্টি করে না। ফলে কোন সমস্যার উদ্ভব হয় না।
চীন, কোরিয়া, উত্তর ভিয়েতনাম তার প্রমাণ।
জনাব বারী দ্বিজাতি তত্ত্ব সাম্প্রদায়িকতার উৎস চেতনা-ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের মাঝে দেখেছেন। কিন্তু চেতনার উৎস বস্তু, ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের ভিত্তি সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার বৈষম্য, নিপীড়ণকে, সমাজের শ্রেণীবিভাগকে অস্বীকার করেছেন।
এভাবে তিনি ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে বিসর্জন দিয়েছেন। আধিবিদ্যক দৃষ্টিকোন দিয়ে ইতিহাসকে বিশ্লেষণ করে ঐতিহাসিক ভাববাদী হয়েছেন।
সাম্প্রদায়িকতা দূর করার বিষয়ে সর্বহারাদের কর্মসূচী হচ্ছে উপরিকাঠামো ও সামাজিক ভিত্তিতে ধর্মীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান, ধর্মীয় সমতা ও সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা।
*ধর্ম হচ্ছে উপরিকাঠামোর অঙ্গ। এর উৎপত্তির কারণ হচ্ছে পশ্চাদপদ উৎপাদন ব্যবস্থা।
ধর্মীয় পার্থক্য দূর করা সম্ভব ধর্মের পুরোপুরি অবসানের সাথে সাথে। এটা সম্ভব বৈজ্ঞানিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক উপরিকাঠামো সৃষ্টির মাধ্যমে। সমাজতন্ত্রের উচ্চতর পর্যায়ে যখন বৈজ্ঞানিক উৎপাদন ব্যবস্থা ও উপরিকাঠামো গড়ে উঠবে তখনই এটা সম্ভব।
মানুষের চিন্তাধারা পরিবর্তনে সময় প্রয়োজন। এ কারনে সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রাথমিক পর্যায় পর্যন্ত ধর্মীয় চেতনার অস্তিত্ব উপরিকাঠামোতে থাকবে। যদিও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে।
এ কারণে সমাজতান্ত্রিক সমাজেও ধর্মীয় অধিকার রয়েছে।
উন্নত পুজিবাদী ইউরোপেও এখনো ধর্ম ও ধর্মীয় সংঘাত রয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডে ধর্মীয় এবং নিপীড়ন বিরোধী সংগ্রাম চলছে।
ইহা প্রমাণ করে বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থায়ও ধর্মীয় নিপীড়ন চলে। কাজেই ধর্মীয় পার্থক্যের ভিত্তিতে বৈরীতা জম্মলাভ করেতে পারে উৎপাদন পদ্ধতি, উপরিকাঠামোতে বৈষম্য নিপীড়ন থাকলে এবং পার্থক্যকে ব্যবহার করার মত প্রতিক্রিয়াশীলদের উপস্থিতির ফলে।
কাজেই সকল ধর্মীয় নিপীড়নের অবসান এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের উৎখাত হলেই সাম্প্রদায়িকতা দূর করা সম্ভব।
এ থেকে দেখা যায়, “যুক্ত বাংলা কায়েম না করে সাম্পদায়িকতা পূর্ববাংলা থেকে দূর করা অসম্ভব, সাম্পদায়িকতা দূর করার জন্য যুক্তবাংলা গঠনের প্রয়োজন” – এ তত্ত্ব ভূল।
সাম্প্রদায়িকতা দূর করার জন্য প্রয়োজন হলো পূর্ব বাংলার প্রতিক্রিয়াশীলদের উৎখাত করে সর্বহারাদের ক্ষমতা দখল করা।
* পূর্ব বাংলার সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার ক্ষমতা দখল হলে কি সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় নিপীড়ন থাকবে?
অর্থাৎ, ভারতের সর্বহারা শ্রেণী যখন ভারতের ক্ষমতা দখল করবে তখন কি সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মীয় নিপীড়ন থাকবে?
মার্কসবাদ সম্বন্ধে যার সামান্য জ্ঞান রয়েছে তিনিও বলবেন এরূপ অবস্থায় পূর্ব বাংলা বা ভারত কোথাও ধর্মীয় নিপীড়ন থাকবে না।
দুই বাংলা পৃথক থাকুক আর একত্রিত হোক সাম্প্রদায়িকতার অস্তিত্বের মৌলিক কারণ সর্বহারা শ্রেণী রাজনৈতিক ক্ষমতায় নেই।
কাজেই “দুই বাংলা পৃথকিকরণ বজায় রেখে কোন অঞ্চল থেকে সাম্প্রদায়িকতা নির্মূল করা এক অবান্তর চিন্তা” – এ বক্তব্য ভূল।
* জনাব বারী লক্ষ্য করলেই দেখতে পেতেন ধর্মীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে ফিলিপাইনের মুসলিম জনগণ সশস্ত্র সংগ্রাম করছে।
কাজেই, ধর্মীয় নিপীড়নের কারনে সশস্ত্র সংগ্রাম, পৃথক হওয়া, দাঙ্গা-রায়ট ঘটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
কাজেই কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে ধর্মীয় নিপীড়নের কারনে পূর্ব বাংলার জনগণ পাকিস্তানে যোগদান করে থাকলে জনগণকে দোষী করা কি ঠিক হবে।
* পূর্ব বাংলার সর্বহারা শ্রেণী পূর্ব বাংলার ক্ষমতা দখল করার মাধ্যমে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে সমাজতান্রিক বিপ্লব পরিচালনা করবে। দুই বাংলা একত্রিত না হলেও বিপ্লব অব্যাহত গতিতে (না থেমে) পরিচালিত হবে।
এর প্রমাণ উত্তর ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া। একত্রীকরণ না হওয়া সত্ত্বেও তারা বিপ্লব অব্যাহত ভাবে চালিয়ে সমজতন্ত্র কায়েম করেছে।
কাজেই, “জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব, সমজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য দুই বাংলার একত্রীকরন প্রয়োজন” – এ বক্তব্য ঠিক নয়।
* “দুই বাংলার কমিউনিস্টদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করা দরকার” – এ বক্তব্যও ভুল।
প্রথমতঃ পশ্চিম বাংলার কমিউনিস্টদের পৃথক কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করা অসর্বহারা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী কাজ।
কারন মার্কসবাদী দৃষ্টিকোন অনুযায়ী ভারতীয় ভৌগলিক সীমারেখার মাঝে একটিই পার্টি হতে পারে।
পূর্ব বাংলার সর্বহারাদের উচিত হবে পূর্ব বাংলার ভৌগলিক সীমারেখার মধ্যে বসবাসকারী সর্বহারাদের নিয়ে একটিই পার্টি গঠন করা; ভারত, বার্মা প্রভৃতি দেশের সর্বহারা পার্টির সাথে ভাতৃপ্রতিম সহযোগিতা করা, কিন্তু তাদের সাথে যোগদান না করা।
যোগদান করার অর্থ হবে পূর্ব বাংলার জাতীয় গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে ক্ষতিগ্রস্থ করা।
কেবলমাত্র কমিউনিস্ট সমাজেই রাষ্ট্রীয় সীমানা থাকবে না। তখনই রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে পৃথক পার্টি গঠনের প্রয়োজনীয়তা থাকবে না, শ্রেণী থাকবেনা এবং পার্টিও থাকবে না।
কাজেই, বর্তমানে যুক্ত বাংলা পার্টি গঠনের প্রস্তাব পূর্ব বাংলার জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব ক্ষতিসাধন করার প্রস্তাব।
একথা চিন্তা করেই দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্টগণ পৃথক পার্টি গঠন করে (People’s Revolutionary Party of South Vietnam) দক্ষিণ ভিয়েতনামে কাজ করছে, যদিও তারা মাতৃভূমির পুনরেকত্রীকরণের কর্মসুচী গ্রহণ করেছে।
* সমগ্র বাংলা বৃটিশদের একটি প্রদেশ ছিল। এর পূর্বে মোগল ও পাঠানদের সময়েও বাংলা তাদের শাসনাধীন ছিল।
মোগল আমলে বা বৃটিশ আমলে বাংলা একটি পৃথক রাষ্ট্র বা দেশ ছিল না। বৃটিশদের দখলের পূর্বে সমগ্র ভারত ছিল পৃথক রাষ্ট্র।
পক্ষান্তরে জাপান দখল করে কোরিয়া( বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া মার্কিনের নিয়ন্ত্রণে) এবং ফ্রান্স দখল করে ভিয়েতনাম (বর্তমানে দক্ষিণ ভিয়েতনামের কিছু অংশ মার্কিনের নিয়ন্ত্রণে) যাদের পৃথক রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব ছিল।
স্বাভাবিকভাবেই কোরিয়া ও ভিয়েতনামের জনগণ মাতৃভূমির মুক্তি চেয়েছে। বর্তমানে খণ্ডিত মাতৃভূমির একত্রীকরণের জন্য সংগ্রাম করছে।
কাজেই, ভিয়েতনাম, কোরিয়ার উদাহরণ তুলনা করলে সমগ্র পাক-ভারতের সংযুক্তি দাবী করা যুক্তিসঙ্গত; শুধু যুক্ত বাংলা নয়।
বৃটিশ আমলে মাতৃভূমি বলতে বুঝাতো সমগ্র পাক-ভারত। কাজেই মাতৃভূমির পুনরেকত্রিকরণ বলতে সমগ্র পাক-ভারত উপমহাদেশের একত্রীকরণ দাবী করা বুঝায়।
বৃটিশ আমলে সমগ্র পাক-ভারতের জনগণ বৃটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। তার প্রমাণ ১৮৫৭ সালের সংগ্রাম, অনুশীলন, যুগান্তর, সূর্যসেনের সংগ্রাম; এমনকি সূভাষ বোসও স্বাধীন বাংলার জন্য সংগ্রাম করেনি।
কাজেই মাতৃভূমির একত্রীকরণ বলতে পাক-ভারতের একত্রীকরণ না বুঝিয়ে দুই বাংলার একত্রীকরণ বুঝানো ঠিক নয়।
ইহাও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ।
* জনাব বারী বলেছেন, “দ্বিজাতি তত্ত্বের প্রভাবে ভারতের প্রায় প্রত্যেকটি জাতি সাম্প্রদায়িকভাবে হিন্দু মুসলিম দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে।”
তাহলে দ্বিজাতি তত্ত্ব ধ্বংস করার কর্মসূচী থাকলে শুধু বাঙালীদের জন্য যুক্ত জাতি গঠনের পরিকল্পনা কেন? সমগ্র পাক-ভারতের সকল খণ্ডিত জাতির পুনরেকত্রীকরণের কর্মসূচী প্রদান করা, দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দ্বিখণ্ডিত পাক-ভারতের (বর্তমান দ্বিখণ্ডিত) অবসান করে অখন্ড পাক-ভারত গঠনই এ তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর পরিবর্তে শুধু বাঙালী জাতির কথা চিন্তা করা হচ্ছে “আমি বাঙালী তাই বাঙালীর কথা চিন্তা করি” – এ সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের বহিঃপ্রকাশ যা আন্তর্জাতিকতাবাদের বিরোধী।
উপরন্তু, একটি সমাধান মার্কসবাদী তত্ত্ব বলে তখনই পরিগণিত হবে যখন একই ধরণের সমস্যার ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য।
জনাব বারীর “দ্বিজাতি তত্ত্বের অবসানের তত্ত্ব” অন্যান্য খণ্ডিত জাতির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে তা মার্কসবাদ নয়।
* হিন্দু প্রধান পশ্চিম বাংলার সাথে পূর্ব বাংলার একত্রীকরণের কথা বললে পূর্ব বাংলার হিন্দু জনসাধারণকে দলে টানা যাবে – এ ধারণা থেকে এ তত্ত্ব বলার অর্থ হবে হিন্দু জনসাধারণের দেশপ্রেমকে খাটো করা, তাদেরকে সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মনে করা।
হিন্দু জনসাধারণসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখালঘুদের প্রতি সর্বহারাদের কর্মসূচী হওয়া উচিৎ সকল ক্ষেত্রে ধর্মীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের অবসান, ধর্মীয় সমতা কায়েম। এ ভিত্তিতেই তাহাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করা উচিত।
কিন্তু যুক্ত বাংলার কথা বলে তাদের দলে টানার অর্থ চচ্ছে সুবিধাবাদের জন্য তত্ত্ব তৈরী করা।
এটা হচ্ছে তত্ত্বের ক্ষেত্রে সুবিধাবাদ।
*উক্ত কমরেডগণ অতীতে জাতীয়তাবাদকে (পূর্ব বাংলার জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা) বিরোধিতা করেছেন। বর্তমানে যুক্ত বাংলা চাচ্ছেন। এভাবে তারা জাতীয়তাবাদ বিরোধী থেকে অতিজাতীয়তাবাদী হয়ে গেছেন।
এটা হচ্ছে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ক্ষুদে বুর্জোয়াদের ডানে বামে রূপান্তরের প্রমাণ। কাজেই রাজনৈতিক লাইন নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তারা এখনো ক্ষুদে বুর্জোয়া রয়েছেন।
খতমের ক্ষেত্রে, চারু মজুমদারের ক্ষেত্রেও তারা একই কাজ করেছেন।
অতীতে তারা অতি খতম করেছেন; বর্তমানে মোটেই খতম করতে ইচ্ছুক নন।
চারূ মজুমদারকে অতি জিন্দাবাদ দিয়েছেন; বর্তমানে অতি মুর্দাবাদ দেন।
* জনাব বারী প্রশ্ন তুলেছেন, “আমাদের বিপ্লবের বর্তমান স্তর হচ্ছে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর – এ বক্তব্য কি সঠিক?’’
এ প্রশ্ন উত্থাপনের অর্থ হচ্ছে পূর্ব বাংলার বিপ্লবের চরিত্র যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক তা না বুঝা। এই না বুঝার মাঝেই নিহিত রয়েছে তাদের যুক্ত বাংলার বক্তব্যের বীজ।
জাতি গঠিত হয় বুর্জোয়া উৎপাদনের পদ্ধতির বিকাশের প্রক্রিয়ায়। সামন্তবাদী যুগে জাতি গঠিত হয় না। বুর্জোয়া উৎপাদন ব্যবস্থায় পন্য দ্রব্য উৎপাদন ও বিনিময়ের সুবিধার্থে ভাষাভিত্তিক জাতি গঠিত হয়।
এই বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতির বিকাশ বাধা প্রাপ্ত হয় বলেই বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালিত হয়।
বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের লক্ষ্য দুটি —
জাতীয় বিপ্লবের মাধ্যমে বৈদেশিক শোষকদের উৎখাত এবং বৈদেশিক শোষণের ভিত্তি সামন্তবাদকে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মাধ্যমে উৎখাত করা। এজন্য ইহা জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব বলে পরিচিত।
এ বিপ্লবের লক্ষ্য হচ্ছে বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতির প্রাধান্য স্থাপন। ইউরোপে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রক্রিয়ায় ভাষাভিত্তিক জাতি, জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র (প্রায়ই ক্ষেত্রেই) গঠিত হয় বহু পূর্বে।
পাক-ভারত উপমহাদেশ, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় সাম্রাজ্যবাদী উপনিবেশবাদীদের শোষণ-লুন্ঠন ও নিয়ন্ত্রণের ফলে বুর্জোয়া উৎপাদন পদ্ধতি বিকাশ লাভ করেনি। ভাষাভিত্তিক জাতি, জাতিভিত্তিক রাষ্ট্র গঠিত হতে পারেনি।
এ কারণেই এ সকল এলাকায় জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালনা ও সম্পন্ন করতে হবে—বিভিন্ন জাতি রয়েছে এরূপ এলাকার জন্য জাতীয় আত্ননিয়ন্ত্রণ অধিকার প্রদানের ( জাতীয় বিকাশ অব্যাহতভাবে চলার সুযোগ প্রদানের জন্য) কর্মসূচী গ্রহণ, ধর্মীয় ভাষাগত দ্বন্দ্বের সমাধানের জন্য ধর্মীয় ভাষাগত নিপীড়ন অবসানের এবং ধর্মীয়, ভাষাগত সামাবিধানের কর্মসূচী গ্রহন করতে হবে।
এগুলো হচ্ছে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের বৈশিষ্ট্য।
* প্রত্যক্ষ উপনিবেশের সংজ্ঞায় জনাব বারী বলেছেন, “যখন কোন সাম্রাজ্যবাদ কোন অনুন্নত দেশকে স্বীয় সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বে এনে সেই দেশের সামন্তবাদী ও দালাল বুর্জোয়াদের সাথে আঁতাত করে সেই দেশের শাসন ক্ষমতাকে পরিচালনা করে অথবা পুতুল সরকারের মাধ্যমে শাসন ক্ষমতাকে প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে তখন সেই দেশকে বলা হয় সাম্রাজ্যবাদের উপনিবেশ।”
জনাব বারী অন্যত্র বলেছেন, “ভারতীয় বাহিনী পূর্ব বাংলা দখল করে, পূর্ব বাংলার উপর ভারতীয় দাসত্ব চেপে বসে। শেখ মুজিব ও তার দল দিয়ে পুতুল সরকার গঠন করে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।”
পূর্বে বর্ণিত উপনিবেশের সংজ্ঞার সাথে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের কার্যকলাপে কোন তফাত নেই। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী না হয়েও একই ধরণের কাজ করছে! সম্প্রতি সিকিমেও করেছে।
কাজেই জনাব বারীর সংজ্ঞা অনুযায়ীই পূর্ববাংলা ভারতের উপনিবেশ, যদিও ভারত একটি সাম্রাজ্যবাদী দেশ নয়, সম্প্রসারণবাদী দেশ।
কিন্তু জনাব বারী পূর্ববাংলাকে ভারতের উপনিবেশ না বলে আশ্রিত রাজ্য বলছেন কেন?
কোন দেশ সাম্রাজ্যবাদ না হলেও উপনিবেশ কায়েম করতে পারে, এ বক্তব্য তিনি জ্ঞাতে স্বীকার করতে চান না (যদিও বক্তব্যের মাধ্যমে স্বীকার করেন) কারণ, সর্বহারা পার্টির বক্তব্যকে তাহলে স্বীকার করতে হয়। তাই তিনি আশ্রিত রাজ্য বলে দুর্বোধ্যতার আশ্রয় নিয়েছেন।
* পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি পূর্ববাংলায় মার্কিন ও সোভিয়েটের শোষণ ও লুন্ঠন এবং তাদের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে স্বীকার করে এবং মার্কিন ও সোভিয়েটের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের দ্বন্দ্ব মৌলিক দ্বন্দ্ব বলে উল্লেখ করেছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে, পূর্ববাংলার সামাজিক বিকাশের জন্য নিম্নলিখিত দ্বন্দ্বসমূহ দায়ীঃ
১। ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় দ্বন্দ্ব।
২। সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় দ্বন্দ্ব।
৩। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের সাথে পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় দ্বন্দ্ব।
৪। মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের সাথে সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার দালালদের দ্বন্দ্ব।
৫। পূর্ববাংলার সামন্তবাদের সাথে কৃষক জনতার দ্বন্দ্ব।
৬। পূর্ববাংলার বুর্জোয়া শ্রেণীর সাথে শ্রমিক শ্রেণীর দ্বন্দ্ব।
এরপরেও মার্কিন সোভিয়েটের শোষণ, লুন্ঠন, নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি করে না বা তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে স্বীকার করে না এটা বলা সত্যের অপলাপ ব্যতীত আর কিছুই নয়।
* বাংলাদেশ পুতুল সরকার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থরক্ষা করে, এটা সকলেই স্বীকার করেন।
এরা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ, সোভিয়েট সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদ, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদের স্বার্থ রক্ষা করছে। পূর্ববাংলার আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদ ও সামন্তবাদের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশ সরকার পরিচালনা করছে; জাতীয় বুর্জোয়া, ক্ষুদে বুর্জোয়া বা অন্যান্য দেশপ্রেমিকরা নয়।
কাজেই বাংলাদেশ পুতুল সরকার ছয় পাহাড়ের স্বার্থ রক্ষা করছে। যেহেতু বাংলাদেশ পুতুল সরকার ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের স্বার্থ রক্ষা করছে, সেহেতু সে ভারতীয় সামন্তবাদের স্বার্থেরও সেবা করছে।
বাংলাদেশ পুতুল সরকারকে ছয় পাহাড়ের প্রতিনিধি বলে পূর্ববাংলার দেশপ্রেমিক শ্রেণীসমূহ থেকে পৃথক করা হয়েছে। এ বক্তব্য সঠিক।
* মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ যখন পূর্ববাংলার বিপ্লবের মিত্র হবে তখনই তাকে উৎখাত না করে তার সাথে মিত্রতার সম্পর্ক পাতানো হবে।
তারা এখনো আমাদের মিত্র হয়নি, নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশ দখল করে নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে মাত্র।
কাজেই বর্তমানে তাকে উৎখাত না করার কোন কারণ নেই।
কাজেই তাকে উৎখাত করার সর্বহারা পার্টির বক্তব্য সঠিক।
* জনাব বারী উপসংহারে বলেছেন, “তাদের (পূর্ববাংলার সর্বহারা বিপ্লবীদের) সকল প্রকার সংকীর্ণতা, একপেশে ও গোড়ামীবাদ পরিহার করে খোলা মন হতে হবে এবং ঐক্যের ইচ্ছা নিয়ে পরস্পরের সাথে মত বিনিময় করতে হবে। … … …
আবার বলি, পূর্ববাংলার বিপ্লব সফল করতে হলে পূর্ববাংলার কমিউনিস্টদের ঐক্য দরকার … … …।”
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি সর্বহারা বিপ্লবীদের ঐক্যের জন্য যে পরিকল্পনা পেশ করেছে তার সাথে জনাব বারীর ঐক্যের বক্তব্য সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কাজেই জনাব বারী যদি তার কথার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করে থাকেন, তাহলে তার প্রতিশ্রুতি মোতাবেক পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সাথে ঐক্যের কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত।
আশা করা হচ্ছে, জনাব বারী ঐক্যের কার্যক্রম গ্রহণ করবেন, গ্রুপ হিসেবে বিরাজ পরিত্যাগ করবেন।
গ্রুপ হিসেবে বিরাজের অভ্যাস খারাপ। এটা উপদলবাদ, নেতাবাদ, বিভেদপন্থীবাদ, দুর্গের মনোভাবের জন্ম দিতে পারে এবং তার জোরদার হতে পারে।

নোটঃ

উৎপাদক শক্তি (Productive Forces):

উৎপাদনের যন্ত্রাদি, যার দ্বারা বৈষয়িক মূল্যসম্পন্ন বস্তু (খাদ্য, কাপড়-চোপড়, পাদুকা, ঘর-বাড়ি, চিকিৎসা সামগ্রী ইত্যাদি) তৈরী হয় এবং জনগণ, যারা নির্দিষ্ট উৎপাদনের অভিজ্ঞতা ও শ্রমের দক্ষতার কারণে এ সকল যন্ত্রাদি চালায়, বৈষয়িক দ্রব্যাদি উৎপাদন করে—সম্মিলিতভাবে গঠন করে সমাজের উৎপাদিকা শক্তি (জনগণ ও যন্ত্রাদি)। উৎপাদিকা শক্তির সবচাইতে সচল অংশ হলো জনগণ।

উৎপাদন সম্পর্ক (Relation of Production):

উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় মানুষের পরস্পরের মাঝে যে সম্পর্ক হয়—তা-ই হচ্ছে উৎপাদনের সম্পর্ক। উৎপাদনের সম্পর্ক শোষণের হতে পারে, আবার শোষণহীন হতে পারে।
দাস-সমাজ থেকে বুর্জোয়া সমাজ পর্যন্ত উৎপাদনের সম্পর্ক হচ্ছে শোষণের সম্পর্ক।
সমাজতান্ত্রিক সমাজ, কমিউনিস্ট সমাজ হচ্ছে শোষণহীন উৎপাদন সম্পর্কের সমাজ।

সামাজিক ভিত্তি ( Basis of Society):

উৎপাদক শক্তি ও উৎপাদন সম্পর্ক মিলে হয়ে উৎপাদনের ব্যবস্থা (Mode of Production)। এটাই হচ্ছে সমাজের ভিত্তি।

সমাজের উপরিকাঠামো (Superstructure of Society):

রাষ্ট্র, রাজনীতি ও সংস্কৃতি ইত্যাদি।