সিরাজ সিকদার রচনাঃ পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিজয় অনিবার্য (পার্টির ২য় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি) (জুন ১৯৭৩)

সিরাজ সিকদার রচনা

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিজয় অনিবার্য

(পার্টির ২য় প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি)

(জুন ১৯৭৩)

sikder

১৯৭৩ সালের ৩রা জুন পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি তার প্রতিষ্ঠার দ্বিতীয় বর্ষ অতিক্রম করছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি এ দু’বছরে অর্জন করেছে অতিশয় মূল্যবান অভিজ্ঞতা, পার্টি গঠন, সশস্ত্র সংগ্রাম ও জাতীয় মুক্তিফ্রন্টের সাথে জড়িত বহু মৌলিক সমস্যাবলীর সমাধান।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার সার্বজনীন সত্যকে আরো অধিকতর সফলতার সাথে পূর্ববাংলার বিপ্লবের বিশেষ অবস্থার সাথে সমন্বিত করতে সক্ষম হয়েছে।
এ সময়ের মাঝে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি—
সশস্ত্র সংগ্রামের তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে;
জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সঠিকভাবে রাজনৈতিক লাইন নির্ণয়ের দক্ষতা অর্জন করেছে;
পার্টির মধ্যকার উপদলকে সাফল্যজনকভাবে পরাজিত ও ধ্বংস করার অভিজ্ঞতা লাভ করেছে;
ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণী উদ্ভূত কর্মীদের মতাদর্শগত পুনর্গঠনের পদ্ধতি আয়ত্ব করেছে;
পার্টির মধ্যকার সংগ্রাম সঠিকভাবে পরিচালনার উপায় উপলব্ধি করেছে;
পার্টির বাইরের বিপ্লবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার সঠিক পন্থার উদ্ভাবন করেছে। এভাবে শ্রেণীগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখার সমস্যার সমাধান করেছে;
পার্টি-বহির্ভূত জনসাধারণকে ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত করার জন্য ঐক্যফ্রন্টের লাইন কার্যকরী করার উপায় উদ্ভাবন করেছে। এভাবে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার সমস্যার সমাধান করেছে;
সামরিক রণনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং সে অনুযায়ী কর্তব্য নির্ধারণ করতে পেরেছে;
সামরিক ক্ষেত্রে সুসংবদ্ধকরণ, মানোন্নয়ন, সহজ প্রশাসন, এককেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখা, বাসি উপাদান বর্জনের সমাধান করেছে;
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি এ সময়ের মাঝে বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিকাশের ইতিহাসে এই দু’বছর হচ্ছে সুবর্ণকাল।

বিপ্লব করার জন্য প্রয়োজন বিপ্লবী পার্ট। পূর্ববাংলার জনগণের জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম বারবার ব্যর্থ হয়েছে বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্বের অভাবে।
সুদীর্ঘ দুইশত বছরের সংগ্রামের ফলে বৃটিশেরা উৎখাত হলেও জনগণের জাতীয় মুক্তি ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম সফল হয়নি, আমলাতান্ত্রিক পুঁজিপতি ও সামন্তবাদীরা পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের ফলে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসমাপ্ত রয়ে যায়।
পূর্ববাংলার জনগণ জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার জন্য বারংবার সংগ্রাম করে। লক্ষ লক্ষ জনগণ প্রাণ বিসর্জন দেয়। পূর্ববাংলার আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদীরা ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীদের ডেকে এনে তাদের হাতে পূর্ববাংলাকে তুলে দেয়।
এভাবে বিপ্লবী পার্টির নেতৃত্ব না থাকায় জনগণের এ সকল সংগ্রাম ব্যর্থ হয়।
সুদীর্ঘকালের সংগ্রামের ইতিহাস প্রমাণ করছে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্ব ব্যতীত অন্য কোন শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টির নেতৃত্বে জনগণের মুক্তি আসতে পারে না।
পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণী হচ্ছে পূর্ববাংলার সবচাইতে প্রগতিশীল বিকাশমান শ্রেণী, যার রয়েছে বিপ্লব করার বৈজ্ঞানিক তাত্ত্বিক ভিত্তি মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারা।
পূর্ববাংলার বিপ্লবী জনগণ অতি আগ্রহের সাথে মার্কসবাদকে আঁকড়ে ধরে, নিজেদেরকে সর্বহারায় রূপান্তরের প্রচেষ্টা চালায়, সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি সংগঠিত করা এবং জনগণকে মুক্তির সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানের প্রচেষ্টা চালায়।
কিন্তু অসর্বহারা শ্রেণীর অপরিবর্তিত প্রতিনিধিরা সর্বহারাদের নেতৃত্ব দখল করে, সর্বহারা বিপ্লবী পার্টির পরিবর্তে সংশোধনবাদী-সংস্কারবাদী পার্টি গড়ে তোলে, সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাদেরকে বিপথে পরিচালনা করে।
এ সকল সংশোধনবাদীদের উৎখাত করে সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পূর্ববাংলার সর্বহারা বিপ্লবীরা প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৬৮ সালের ৮ই জানুয়ারী “পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন” প্রতিষ্ঠা করে।
পূর্ববাংলার বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসে এভাবে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। অনভিজ্ঞ তরুণ বিপ্লবীরা পর্বতপ্রমাণ বাঁধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করে বিপ্লবী অনুশীলনে লেগে থাকে, তত্ত্ব ও অনুশীলনের সমন্বয় সাধন করা এবং মার্কসবাদের সার্বজনীন সত্যকে আয়ত্ত করার প্রচেষ্টা চালায়।
তাদের শিশুসুলভ অনভিজ্ঞতা, অপরিপক্কতা অভিজ্ঞতা ও পরিপক্কতায় রূপ লাভ করতে থাকে। এভাবে তারা সর্বহারা শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি প্রতিষ্ঠার যোগ্যতা অর্জন করে।
মহান পেয়ারাবাগানে পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের কামানের গোলার শব্দের মাঝে ১৯৭১ সালের ৩রা জুন প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ববাংলার সর্বহারা শ্রেণীর বিপ্লবী রাজনৈতিক পার্টি “পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি”; সমাপ্ত হয় পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকা।
এভাবে পূর্ববাংলার বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসে সূচনা হয় এক নতুন অধ্যায়ের। পূর্ববাংলার জনগণের বিপ্লবী সংগ্রাম পরিচালনার জন্য একটি বিপ্লবী পার্টির অনুপস্থিতি দূর করার লক্ষ্য সামনে রেখে পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি বিপ্লবী অনুশীলন চালিয়ে যায়।

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি প্রতিষ্ঠার প্রথম থেকেই সশস্ত্র সংগ্রামকে জনগণের মুক্তির একমাত্র পথ বলে গ্রহণ করে।
সশস্ত্র সংগ্রামকে পার্টির প্রধান ধরণের সংগ্রাম, সশস্ত্র বাহিনীকে পার্টির নেতৃত্বে প্রধান ধরনের সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার লাইন গ্রহণ করে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি বীরত্বের সাথে পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনা করে। একই সাথে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের পূর্ববাংলা দখলের চক্রান্তকে বিরোধিতা করে।
একদিকে পাক-সামরিক ফ্যাসিস্টদের, অন্যদিকে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদারদের প্রচণ্ড চাপের মুখেও পার্টি টিকে থাকে, অব্যাহতভাবে তৎপরতা চালিয়ে যায়।
বহু কর্মী, গেরিলা ও সহানুভূতিশীল এবং সমর্থক মহান আত্মবলিদানের মাধ্যমে এ সময়কার সংগ্রামকে উজ্জ্বল করে গেছেন।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে ভারতীয় সম্প্রসারনবাদীদের পূর্ববাংলা দখল, পুতুল সরকার কায়েমের পরিপ্রেক্ষিতে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঠিক মূল্যায়ন করে ও সঠিক রাজনৈতিক লাইন প্রণয়ন করে।
এ সময় পার্টি সাফল্যজনকভাবে তার প্রথম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত করে এবং রাজনৈতিক লাইন প্রণয়ন করে।
পার্টি কংগ্রেসে সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গোড়ামীবাদকে পার্টির প্রধান বিপদ হিসেবে।
কংগ্রেসে পার্টির নতুন নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়।
কংগ্রেসে কিছুসংখ্যক ভাগ্যান্বেষী, সুযোগ সন্ধানী, সুবিধাবাদী নেতৃত্বে অনুপ্রবেশ করে। অচিরেই তারা পার্টির অভ্যন্তরস্থ ও বাইরের সুবিধাবাদীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে পার্টির ক্ষমতা দখল এবং পার্টিকে ধ্বংস করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তারা পার্টির মাঝে উপদলীয় কার্যকলাপ চালায় এবং চক্র গঠন করে। এভাবে বিশ্বাসঘাতক ফজলু-সুলতান চক্রের উদ্ভব হয়।
পার্টির সঠিক লাইন, পার্টির নেতৃত্বের সতর্কতা, কর্মীদের আন্তরিকতার কারণে চক্র তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হয়।
চক্রের প্রতিক্রিয়াশীল প্রভাব সমূলে উৎপাটিত করার জন্য পার্টি ব্যাপক মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা করে। এ উদ্দেশ্যে কতিপয় বিষয়ের উপর শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা হয়।
এভাবে পার্টি মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনার মার্কসবাদী রীতি রপ্ত করে।
চক্রের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত সংগ্রাম পরিচালনা, শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা পূর্ববাংলার বিপ্লবী সংগ্রামের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নতুন ঘটনা।
অচিরেই চক্র মতাদর্শগত, রাজনৈতিক, সাংগঠনিকভাবে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হয়, তাদেরকে পার্টি থেকে চিরতরে বহিষ্কার করা হয়। প্রতিবিপ্লবী তৎপরতা চালাতে গিয়ে তাদের কেউ কেউ খতম হয়।
চক্র গঠনের ফলে পার্টির বিকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষতি হয়, কিন্তু চক্রের উদ্ভবের ফলে পার্টির বিভিন্ন বিষয়ে অতিশয় মূল্যবান শিক্ষা অর্জন করেছে। চক্র হচ্ছে পার্টির নেতিবাচক শিক্ষক।
চক্র গঠন সম্ভব হয় গোড়ামীবাদীদের সাথে সংকীর্ণ অভিজ্ঞতাবাদীদের সমন্বয়ের ফলে। পার্টি গোড়ামীবাদ বিরোধী শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেয়।
এ শুদ্ধি অভিযান পরিচালনার প্রক্রিয়ায় পার্টি ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণী উদ্ভূত কর্মীদের মতাদর্শগত পুনর্গঠনের বিষয়ে আরো গভীরতর জ্ঞান অর্জন করে।
পার্টি ক্ষুদে বুর্জোয়া মতাদর্শ ও তার বহিঃপ্রকাশসমূহ গভীরভাবে অধ্যয়ন করে এবং উপলব্ধি করে যে, ক্ষুদে বুর্জোয়া শ্রেণী উদ্ভূত কর্মীদের মতাদর্শগত পুনর্গঠন করাই হচ্ছে উপনিবেশিক-আধা উপনিবেশিক-সামন্তবাদী-আধা সামন্তবাদী দেশের বিপ্লবের মৌলিক সমস্যা।
এ প্রসঙ্গে পার্টি সঠিকভাবে নির্ণয় করে চিন্তার সাথে কর্মের, প্রতিভা-যোগ্যতার সাথে অনুশীলনের, বুদ্ধি-বিচক্ষণতার সাথে উৎপাদন পদ্ধতির সম্পর্ক। কর্ম থেকেই চিন্তার উদ্ভব, কিন্তু চিন্তা আবার কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। অনুশীলন প্রাথমিক, প্রতিভা, যোগ্যতা অনুশীলনের উপর নির্ভরশীল, আবার যোগ্যতা, প্রতিভা অনুশীলনকে প্রভাবান্বিত করে। আগ্রহ, লেগে থাকা, একাগ্রতাই হচ্ছে প্রতিভা। উৎপাদনের পদ্ধতির উপর বুদ্ধি-বিচক্ষণতা নির্ভরশীল, আবার বুদ্ধি-বিচক্ষণতা উৎপাদনের পদ্ধতি পরিবর্তনে সহায়ক।
এভাবে পার্টি চিন্তাধারা পরিবর্তন করার এবং কর্মরীতিকে সংশোধন করার মাধ্যমে উন্নততর কর্মপদ্ধতি চালু করা, কর্মীদের মানোন্নয়ন করা, যোগ্য প্রতিভাবান কর্মী সৃষ্টি করার সমস্যা সমাধানের চাবিকাঠি লাভ করে।
পার্টি আভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা, সঠিকভাবে পার্টি-অভ্যন্তরস্থ সংগ্রাম পরিচালনা করা, সমালোচনা-আত্মসমালোচনা পরিচালনার সমস্যার সমাধান করে।
পার্টি-অভ্যন্তরস্থ ঐক্য বজায় রাখার সাথে সাথে পার্টি-বহির্ভূত বিপ্লবীদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পার্টি বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির উদ্ভাবন করে এবং সে অনুযায়ী প্রচেষ্টা চালায়।
এভাবে পার্টি-অভ্যন্তরস্থ সংগ্রাম পরিচালনা করা, আভ্যন্তরীন ঐক্য বজায় রাখা, একই সাথে বাইরের বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ করার মাধ্যমে শ্রেণীগত ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও তা বজায় রাখার উপায় উদ্ভাবন করে। পার্টি শ্রেণীগত ঐক্য প্রতিষ্ঠার সাথে সাথে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য পদক্ষেপ নেয়।
পূর্ববাংলার জনগণের ব্যাপক অংশই দেশপ্রেমিক। এদের বিরাট অংশ হচ্ছে ক্ষুদে বুর্জোয়া। এরা পূর্ববাংলার বিপ্লবের মৌলিক মিত্র। এদেরকে পার্টি-নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করার উপর বিপ্লবের বিজয় অর্জন নির্ভর করছে।
কাজেই এদেরকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সর্বহারা শ্রেণীর নেতৃত্বে প্রয়োজনীয় সংগঠন গড়ে তোলা অপরিহার্য।
পূর্ববাংলার ক্ষুদে বুর্জোয়া এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ করা যায়—এরূপ সংগঠন হচ্ছে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট এবং তার সাথে যুক্ত সংগঠনসমূহ।
পার্টি এভাবে পূর্ববাংলার জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সমগ্র জনগণকে পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত করার জন্য জাতীয় মুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এভাবে পার্টি পূর্ববাংলার ক্ষুদে বুর্জোয়া এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিক শ্রেণী, স্তর, জাতিগত, ভাষাগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগণকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধভাবে পরিচালিত ও সংগঠিত করার সঠিক লাইন গ্রহণ করেছে।
এ সময় পার্টি সামরিক ক্ষেত্রেও মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ এবং সুদুরপ্রসারী তাৎপর্য সম্পন্ন সমস্যার সমাধান করে যা সশস্ত্র সংগ্রাম, পার্টি-বিকাশের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।
পার্টি জাতীয়্ শত্রু খতমের সাথে যুক্ত সমস্যাবলীর সমাধান করে, সশস্ত্র প্রচার টিমের মাধ্যমে গ্রাম্য প্রচারের অতিশয় কার্যকর পদ্ধতির উদ্ভাবন করে।
পার্টি সামরিক রণনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং সে অনুযায়ী পার্টির মতাদর্শগত, সাংগঠনিক, রাজনৈতিক ও সামরিক কাজ নির্ধারণের পদ্ধতি আবিষ্কার করে।
পার্টি সাংগঠনিক ক্ষেত্রেও বিরাট সাফল্য অর্জন করেছে। কর্মীদের মানোন্নয়ন ও কর্মীস্বল্পতা দূর করার মত পার্টি-বিকাশের মৌলিক সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।
এ সময়ে পার্টি অর্জন করেছে বিপ্লবে কর্মী ও নেতৃত্বের ভূমিকা, পার্টি ও বিপ্লবের স্তরের সাথে নেতৃত্বের যোগ্যতার সম্পর্ক, পার্টির মাঝে এক কেন্দ্র বজায় রাখা ও তা শক্তিশালী করা, উন্নততর নেতৃত্ব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণাসমূহ।
পার্টির বিকাশের সাথে যুক্ত আনুষ্ঠানিকতা, শ্রমবিভাগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সারসংকলন, সহজ প্রশাসন ব্যবস্থা পার্টির বিভিন্ন স্তর আয়ত্ব করছে।
পার্টিকে সাংগঠনিকভাবে সুসংবদ্ধ করার পূর্বে প্রয়োজন মতাদর্শগতভাবে সুসংবদ্ধকরণ। মতাদর্শগত সুসংবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া, বাসিটা অর্জন, টাটকাটা গ্রহণ, মানোন্নয়ন, কেডার ইতিহাস সংগ্রহ ও যাচাই, এককসমূহ গঠন, সদস্য, প্রার্থীসদস্যপদ প্রদান প্রভৃতি সম্পন্ন করার মাধ্যমে সাংগঠনিক সুসংবদ্ধকরণের পদ্ধতি পার্টি আয়ত্ত করছে।
সাংগঠনিক অনুশীলনের মাধ্যমে কাজের স্তর নির্ণয় করা (বিকাশ না সুসংবদ্ধকরণ, সশস্ত্র সংগ্রাম না প্রস্তুতি, পশ্চাদপসারণ ইত্যাদি), নিজেকে জানা এবং সে অনুযায়ী কর্মপন্থা স্থির করা, সামগ্রিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা, সে অনুযায়ী দ্বিমাসিক, ষান্বাসিক, বাৎসরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার করা, কর্মশক্তর যথাযথ ব্যবহার করা এবং আরো বহু দৈনন্দিন রীতিনীতি ও কৌশল পার্টি শিখেছে।
কিন্তু সাংগঠনিক ক্ষেত্রে পার্টির অঞ্চলসমূহের পরিপূর্ণ ক্ষমতাকে ব্যবহার করা, সঠিকভাবে কার্য পরিচালনার মত যোগ্য নেতৃত্বের মারাত্মক অভাব রয়েছে।
পার্টিকে অবশ্যই এ অভাব কাটিয়ে তুলতে হবে।

পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে, সঠিক রাজনৈতিক লাইন সঠিক সাংগঠনিক ও সামরিক লাইনে প্রকাশ পায়।
সঠিক রাজনৈতিক লাইন আকাশ থেকে পড়ে না বা সহজাত নয়। সঠিক রাজনৈতিক লাইনের উদ্ভব সঠিক মতাদর্শগত লাইন থেকে অর্থাৎ মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার সার্বজনীন সত্যকে পূর্ববাংলার বিপ্লবের বিশেষ অনুশীলনে সমন্বয়ের ফলে।
একটি সঠিক লাইন অবশ্যই ভুল লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বিকাশ লাভ করে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির সঠিক লাইনসমূহ পার্টির অভ্যন্তরস্থ ও বাইরের ভুল লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বিকাশ লাভ করেছে।
এ সকল ভুল লাইন হচ্ছে ডানপন্থী এবং আকৃতিগতভাবে বাম কিন্তু সারবস্তুগতভাবে ডানপন্থী।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি ডান লাইন এবং ক্ষুদে বুর্জোয়া অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে অতি বাম লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সঠিক পথে অব্যহতভাবে বিকাশ লাভ করে।
পার্টির বাইরে দক্ষিণপন্থী মনিসিং-মোজাফফর সংশোধনবাদী, কাজী-রণো এবং দেবেন-বাসার, আর আকৃতিগতভাবে বাম কিন্তু সারবস্তুগতভাবে ডান হক-তোয়াহাঁ, মতিনদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম পরিচালনা করে পার্টি অগ্রসর হয়।
উপরোক্ত মার্কসবাদী নামধারী গ্রুপসমূহের অস্তিত্ব সর্বহারা শ্রেণী ও জনগণের ঐক্যের পথে মারাত্মক প্রতিবন্ধকতা বিসেবে কাজ করছে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি সর্বহারা বিপ্লবীদেরকে শ্রেণীগত ঐক্যের লাইন, জাতীয় ভিত্তিতে ঐক্যের জন্য জাতীয় ঐক্যের লাইন এবং সাধারণ কর্মীদের সাথে সংযোগের লাইন দিচ্ছে।
এ ত্রিমুখী নীতির ফলে কিছুসংখ্যক শত্রুচর ও সুবিধাবাদী ব্যতীত বিভিন্ন গ্রুপের সাথে যুক্ত সাধারণ খাঁটি কর্মীরা অবশই সর্বহারা পার্টির সাথে ঐক্যবদ্ধ হবেন।
কাজেই এ সকল গ্রুপের অস্তিত্ব খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে এসেছে।
তবে যতদিন শত্রু এলাকা থাকবে ততদিন মার্কসাবাদী নামধারী গ্রুপ সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। এমনকি কিছু কিছু গ্রুপ সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু এ সকল গ্রুপ প্রতিনিয়ত উত্থাপিত সমস্যাবলীর সমাধান, কর্মীদের মানোন্নয়ন, লেগে থাকা ও লক্ষ্য অর্জন করার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে সক্ষম হবে না। ফলে তাদের সাধারণ কর্মীরা সর্বহারা পার্টির সাথে যুক্ত হবে, শত্রুচর ও সুবিধাবাদীরা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে ও ধ্বংস হবে।

পঁচিশে মার্চের পূর্বে পূর্ববাংলা শ্রমিক আন্দোলন অল্প কয়েকটি শহরের বুদ্ধিজীবীদের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল। ইহা হচ্ছে পার্টি-বিকাশের প্রথম পর্যায়।
পঁচিশে মার্চের পরবর্তী সময় পার্টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে, গ্রামের কাজ শহরের চাইতে বিস্তৃত হয়। পার্টি শহরের ও গ্রামের বুদ্ধিজীবীদের মাঝে প্রধানতঃ বিকাশ লাভ করে।
ইহা হচ্ছে পার্টি-বিকাশের দ্বিতীয় স্তর।
বর্তমানে পার্টি পূর্ববাংলার প্রায় জেলাতেই বিস্তৃত হয়েছে। শহর ও গ্রামের বুদ্ধিজীবীদের মাধ্যমে শ্রমিক ও কৃষকদের মাঝে পার্টি শেকড় গাড়ছে।
অর্থাৎ পার্টি তার বিকাশের তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে। অচিরেই পার্টি সমগ্র দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে। শহরের ও গ্রামের শ্রমিক, কৃষক এবং ক্ষুদে বুর্জোয়া জনগণের মাঝে শেকড় গাড়বে। এভাবে পার্টি জাতীয় ও গণভিত্তিক পার্টিতে পরিণত হবে।
অচিরেই পার্টির নেতৃত্বে বিস্তৃত অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়বে, বিরাটাকার গেরিলা অঞ্চল গড়ে উঠবে, কোন কোন এলাকায় ঘাঁটি গঠনের মত অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।
পার্টির চমৎকার প্রস্তুতি ও সূচনা বিরাটাকার সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
পঁচিশে মার্চের পূর্বেকার তুলনায় লোকজন ও অস্ত্রের দিক দিয়ে পার্টির বিকাশ হয়েছে কয়েক শত গুণ আর চিন্তার ক্ষেত্রে পার্টির বিকাশ হয়েছে কয়েক হাজার গুণ।

ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও তার তাবেদার আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের শোষণ ও লুন্ঠনের ফলে জনগণ আজ বিদ্রোহ উন্মুখ। তারা উপলব্ধি করেছে, তাদের রক্ত বৃথা গিয়েছে। তাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের সংগ্রাম অসমাপ্ত রয়েছে।
জনগণ আজ সঠিক নেতৃত্ব কামনা করে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি জনগণের এ মহান বিপ্লবী সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানের মত মতাদর্শগত, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।
জনগণকে বর্ষাকালে আওয়ামী লীগ ফ্যাসিস্টদের রণনৈতিক আক্রমণে নেতৃত্ব প্রদানের চমৎকার প্রস্তুতি পার্টি অর্জন করেছে। পার্টির বিরাট সাফল্যে মাথা বিগড়ালে চলবে না, মাথা ঠিক রেখে অভিজ্ঞতার সারসংকলন করে আরো অধিকতর সফলতা অর্জন করতে হবে। জনগণের মুক্তির পথে এ সফলতা প্রস্তুতি মাত্র, কয়েক হাজার মাইলের পথের এক মাইলের মত। কাজেই অধ্যবসায়ী হয়ে সকল বাধা-বিঘ্ন দূর করে বিজয় অর্জনের জন্য লেগে থাকতে হবে।
আরো অধিকতর সফলতা অর্জনের জন্য কর্মীদের চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করতে হবে এনং কর্মরীতিকে সংশোধন করতে হবে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির এ সকল সফলতা অর্জিত হয়েছে কমরেড সিরাজ সিকদার কর্তৃক মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ চিন্তাধারার সার্বজনীন সত্যকে পূর্ববাংলার বিপ্লবের বিশেষ অনুশীলনের সাথে সমন্বয়ের ফলে প্রণীত সঠিক লাইন ও তা বাস্তবায়নে কর্মীদের লেগে থাকার ফলে।
সমগ্র পার্টির কর্মীগণ চিন্তাধারাকে পরিবর্তন এবং কর্মপদ্ধতিকে সংশোধন করবেন, কমরেড সিরাজ সিকদারের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবেন। পার্টি ও বিপ্লবের জন্য আরো অধিকতর বিজয় আনয়ন করবেন।
পার্টি মতাদর্শগত, রাজনৈতিক, সাংগঠনিক, সামরিক ক্ষেত্রের মৌলিক সমস্যাবলীর সমাধান করেছে। এখন প্রয়োজন চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করা, কর্মপদ্ধতিকে সংশোধন করা এবং উপরিউক্ত লাইনসমূহ বাস্তবায়ন করা।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির অভিজ্ঞতা প্রমাণ করছে, লাইন সঠিক হলে ক্ষুদ্র শক্তি বিরাট হয়, সশস্ত্র বাহিনী না থাকলে তা গড়ে উঠে।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির লাইন সঠিক, কাজেই রাজনৈতিক ক্ষমতাও অবশ্যই পার্টি একদিন দখল করতে সক্ষম হবে।
পক্ষান্তরে লাইন ভুল হলে পূর্বে অর্জিত ফলও খোয়া যায়।
হক-তোয়াহা, মতিন-আলাউদ্দিন, মনিসিং-মোজাফফরদের ক্ষেত্রে ইহা প্রযোজ্য।
পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি সূচনাতেই পাকাপোক্ত ভিত গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে, ভাল প্রস্তুতি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রভাত বেলাই দিনের ছবি, ভাল প্রস্তুতি শুভ সমাপ্তির লক্ষণ।
কাজেই পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টির বিজয় অনিবার্য।
পার্টি প্রতিষ্ঠা দিবসে শহীদ ও গ্রেফতারকৃত কমরেডদের জন্য শোক প্রকাশ করা হচ্ছে, তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করার শপথ গ্রহণ করছে সকল কর্মীগণ।
গ্রেফতারকৃতদের উদ্ধার করা এবং তাদের পুনরায় বিপ্লবী অনুশীলনে লাগাবার প্রতিজ্ঞা নিচ্ছে কমরেডরা।
পার্টি পূর্ববাংলার সর্বহারা বিপ্লবীদের দীর্ঘ জীবন কামনা করে, কামনা করে কমরেড সিরাজ সিকদারের দীর্ঘ জীবন।

► পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি—জিন্দাবাদ!
► কমরেড সিরাজ সিকদার—জিন্দাবাদ!
► মার্কসবাদ-লেনিনবাদ-মাওসেতুঙ—জিন্দাবাদ!
► দীর্ঘ দীর্ঘ দিন বেঁচে থাকুন—সভাপতি মাও!